ঢাকা ১২:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিস্তা ইস্যুতে চীনের সক্রিয়তা, ঢাকাকে নিজেদের অবস্থান আবারও জানাল ভারত

নিজস্ব সংবাদ :

চীনের পক্ষ থেকে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বাংলাদেশকে কারিগরি এবং বিস্তৃত সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত। নয়াদিল্লি বলছে, তিস্তা নিয়ে তাদের অবস্থান আগেই বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।

শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশে ভারতের উন্নয়ন সহযোগিতা দুই দেশের পারস্পরিক সম্মত রোডম্যাপ অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং তা নিয়মিত মূল্যায়নের আওতায় থাকে। তিনি বলেন, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি নতুন নয়; এ বিষয়ে ঢাকা পূর্ব থেকেই অবগত।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং দেশটির পানিসম্পদ মন্ত্রী লি গুয়োইংয়ের সঙ্গে বৈঠকে তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। চীন প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছে।

এই অগ্রগতি ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ তিস্তা নদী ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোরের (চিকেনস নেক) নিকটবর্তী এলাকায় অবস্থিত।

বাংলাদেশের দৃষ্টিতে তিস্তা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করা। দীর্ঘদিন ধরে নদীটির পানিপ্রবাহের অনিশ্চয়তা এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকা ও কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকলেও তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সমাধান আসেনি। ২০১১ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

পরবর্তীতে তিস্তা নদীর উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিকল্প অংশীদার হিসেবে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ায় বাংলাদেশ। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পাওয়ারচায়না তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ শুরু করে।

বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা এখন শুধু পানি বণ্টনের বিষয় নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কূটনীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের পাশাপাশি ভারত-চীন প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটেও প্রকল্পটির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

তিস্তা ইস্যুতে চীনের সক্রিয়তা, ঢাকাকে নিজেদের অবস্থান আবারও জানাল ভারত

আপডেট সময় ০৩:১৯:১৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬

চীনের পক্ষ থেকে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বাংলাদেশকে কারিগরি এবং বিস্তৃত সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত। নয়াদিল্লি বলছে, তিস্তা নিয়ে তাদের অবস্থান আগেই বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।

শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশে ভারতের উন্নয়ন সহযোগিতা দুই দেশের পারস্পরিক সম্মত রোডম্যাপ অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং তা নিয়মিত মূল্যায়নের আওতায় থাকে। তিনি বলেন, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি নতুন নয়; এ বিষয়ে ঢাকা পূর্ব থেকেই অবগত।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং দেশটির পানিসম্পদ মন্ত্রী লি গুয়োইংয়ের সঙ্গে বৈঠকে তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। চীন প্রকল্পটির প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছে।

এই অগ্রগতি ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ তিস্তা নদী ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোরের (চিকেনস নেক) নিকটবর্তী এলাকায় অবস্থিত।

বাংলাদেশের দৃষ্টিতে তিস্তা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করা। দীর্ঘদিন ধরে নদীটির পানিপ্রবাহের অনিশ্চয়তা এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকা ও কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকলেও তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সমাধান আসেনি। ২০১১ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

পরবর্তীতে তিস্তা নদীর উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিকল্প অংশীদার হিসেবে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ায় বাংলাদেশ। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পাওয়ারচায়না তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ শুরু করে।

বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা এখন শুধু পানি বণ্টনের বিষয় নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কূটনীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের পাশাপাশি ভারত-চীন প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটেও প্রকল্পটির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।