ঢাকা ১০:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভেনেজুয়েলায় জোড়া শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভয়াবহ বিপর্যয়, মৃত ১৮৮; নিহত ১০ হাজার ছাড়ানোর আশঙ্কা

নিজস্ব সংবাদ :

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় মাত্র ৪০ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভয়াবহ এ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ১৮৮ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে দেশটির সরকার। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে বিপুলসংখ্যক মানুষ আটকা পড়ে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে উদ্ধারকারী দল ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বুধবার বিকেলে রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরের ইয়ারাকুই রাজ্যের রাজধানী সান ফেলিপের কাছে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর মাত্র ৪০ সেকেন্ড পর একই অঞ্চলে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইউমারে শহরের প্রায় ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে।

ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯০০ সালের পর এটি ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। পরপর দুটি বড় কম্পনের পর রাতভর একাধিক পরাঘাতও অনুভূত হয়েছে, যা উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান শুরু হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় ধীরগতির বলে জানিয়েছে বিবিসি। বহু মানুষ এখনো ভবনের নিচে আটকা রয়েছেন। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র ও দুর্ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন অসংখ্য মানুষ। আহতদের অনেককে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুইরা এলাকার বাসিন্দা ৪৯ বছর বয়সী ল্যারি রোজাস জানান, তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকা পড়েছেন। ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে আমাদের কাছে কিছুই নেই। ভেতরে ঢোকার মতো শক্তি বা সাহস কোনোটাই নেই।”

ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, সর্বশেষ হিসাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৮৮ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১ হাজার ৫২০ জন। ধ্বংসস্তূপের নিচে অন্তত ২০০ জন আটকা রয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া প্রায় ২৫০টি ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।

এদিকে ইউএসজিএসের পূর্বাভাসভিত্তিক মডেল বলছে, এই ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সংস্থাটির আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি হতে পারে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতাদের উদ্যোগে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত সেখানে ৩৯ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সরকারি ছুটির দিনে ভূমিকম্প আঘাত হানায় অধিকাংশ মানুষ বাসায় অবস্থান করছিলেন, ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আল-জাজিরাকে স্থানীয় সাংবাদিক পল ডবসন জানান, দুর্গম পাহাড়ি ও নৌপথনির্ভর অনেক এলাকায় এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং উদ্ধার সক্ষমতার ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে চলমান পরাঘাত উদ্ধার অভিযানকে বাধাগ্রস্ত করছে।

ভূমিকম্পের ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে কারাকাসের বাসিন্দা মারিয়া আলেহান্দ্রা বলেন, “নিচে নেমে যা দেখেছি, তা যেন কোনো ভয়াবহ সিনেমার দৃশ্য। চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ। সেগুলো টপকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। একটি ভবন থেকে কেবল একটি পরিবারকে বের হতে দেখেছি।”

আরেক বাসিন্দা কোরো মার্তিনেজ বলেন, “প্রথমে বিকট শব্দ শুনতে পাই। এরপর মুহূর্তেই ঘরের সব আসবাবপত্র কাঁপতে শুরু করে। জীবনে এমন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি।”

অন্যদিকে অ্যাস্ট্রিড রামিরেজ জানান, “কম্পন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চারদিকে মানুষের চিৎকার শুনতে পাই। সবাই প্রাণ বাঁচাতে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে।”

৮০ বছর বয়সী মারিয়া রোমেরো বলেন, পুলিশ তাঁদের নিরাপদে বের হতে সহায়তা করেছে। তাঁর ভাষায়, “এটি ১৯৬৭ সালের ভূমিকম্পের চেয়েও ভয়াবহ। এমন দৃশ্য আমি আগে কখনো দেখিনি।”

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ভেনেজুয়েলায় জোড়া শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভয়াবহ বিপর্যয়, মৃত ১৮৮; নিহত ১০ হাজার ছাড়ানোর আশঙ্কা

আপডেট সময় ০৪:৫৮:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় মাত্র ৪০ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ভয়াবহ এ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ১৮৮ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে দেশটির সরকার। তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে বিপুলসংখ্যক মানুষ আটকা পড়ে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে উদ্ধারকারী দল ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বুধবার বিকেলে রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরের ইয়ারাকুই রাজ্যের রাজধানী সান ফেলিপের কাছে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর মাত্র ৪০ সেকেন্ড পর একই অঞ্চলে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইউমারে শহরের প্রায় ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে।

ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯০০ সালের পর এটি ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। পরপর দুটি বড় কম্পনের পর রাতভর একাধিক পরাঘাতও অনুভূত হয়েছে, যা উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান শুরু হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় ধীরগতির বলে জানিয়েছে বিবিসি। বহু মানুষ এখনো ভবনের নিচে আটকা রয়েছেন। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র ও দুর্ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন অসংখ্য মানুষ। আহতদের অনেককে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুইরা এলাকার বাসিন্দা ৪৯ বছর বয়সী ল্যারি রোজাস জানান, তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকা পড়েছেন। ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে আমাদের কাছে কিছুই নেই। ভেতরে ঢোকার মতো শক্তি বা সাহস কোনোটাই নেই।”

ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, সর্বশেষ হিসাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৮৮ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১ হাজার ৫২০ জন। ধ্বংসস্তূপের নিচে অন্তত ২০০ জন আটকা রয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া প্রায় ২৫০টি ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।

এদিকে ইউএসজিএসের পূর্বাভাসভিত্তিক মডেল বলছে, এই ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সংস্থাটির আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি হতে পারে।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতাদের উদ্যোগে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত সেখানে ৩৯ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সরকারি ছুটির দিনে ভূমিকম্প আঘাত হানায় অধিকাংশ মানুষ বাসায় অবস্থান করছিলেন, ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আল-জাজিরাকে স্থানীয় সাংবাদিক পল ডবসন জানান, দুর্গম পাহাড়ি ও নৌপথনির্ভর অনেক এলাকায় এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং উদ্ধার সক্ষমতার ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে চলমান পরাঘাত উদ্ধার অভিযানকে বাধাগ্রস্ত করছে।

ভূমিকম্পের ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে কারাকাসের বাসিন্দা মারিয়া আলেহান্দ্রা বলেন, “নিচে নেমে যা দেখেছি, তা যেন কোনো ভয়াবহ সিনেমার দৃশ্য। চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ। সেগুলো টপকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। একটি ভবন থেকে কেবল একটি পরিবারকে বের হতে দেখেছি।”

আরেক বাসিন্দা কোরো মার্তিনেজ বলেন, “প্রথমে বিকট শব্দ শুনতে পাই। এরপর মুহূর্তেই ঘরের সব আসবাবপত্র কাঁপতে শুরু করে। জীবনে এমন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি।”

অন্যদিকে অ্যাস্ট্রিড রামিরেজ জানান, “কম্পন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চারদিকে মানুষের চিৎকার শুনতে পাই। সবাই প্রাণ বাঁচাতে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে।”

৮০ বছর বয়সী মারিয়া রোমেরো বলেন, পুলিশ তাঁদের নিরাপদে বের হতে সহায়তা করেছে। তাঁর ভাষায়, “এটি ১৯৬৭ সালের ভূমিকম্পের চেয়েও ভয়াবহ। এমন দৃশ্য আমি আগে কখনো দেখিনি।”