ঢাকা ০৪:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৪৫ বছর পলাতক থাকার পর ধরা পড়লেন জিয়া হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মোজাফফর, মেয়ের সূত্র আর জন্মদাগেই শেষ পর্যন্ত শনাক্ত

নিজস্ব সংবাদ :

সাড়ে চার দশক ধরে আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন। নিজের পরিচয় গোপন রাখতে নাম-পরিচয়, জীবনযাপন এমনকি চেহারার পরিবর্তন করেও শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে পারেননি তিনি। গোয়েন্দাদের দীর্ঘ নজরদারি, মেয়ের কর্মস্থল থেকে পাওয়া তথ্য এবং নাকের নিচের একটি জন্মদাগই তাকে শনাক্ত করার প্রধান সূত্র হয়ে ওঠে।

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, মোজাফফরের মেয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। কয়েক মাস ধরে তার চলাফেরা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দারা বনানী ডিওএইচএসের একটি বাসা চিহ্নিত করেন। এরপর সাধারণ পোশাকে ওই এলাকায় গোপন নজরদারি চালিয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হয়।

গত বুধবার গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে গোয়েন্দারা নিজেদের মেয়ের অফিসের কর্মী পরিচয় দিয়ে বাসার দরজায় যান। দরজা খুলে এক বৃদ্ধ ব্যক্তি বাইরে এলে কর্মকর্তারা তার মুখাবয়ব পর্যবেক্ষণ করেন। নাকের নিচে থাকা একটি পরিচিত জন্মদাগ দেখে সন্দেহ আরও জোরালো হয়। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজেই বলেন, “আমি মোজাফফর, মেয়ের বাবা।” এই স্বীকারোক্তির পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে মোজাফফর হোসেনের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, তিনি ও আরেক সেনা কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির কক্ষে পৌঁছে তাকে বাইরে নিয়ে আসেন এবং গুলি চালানো হয়। পরে তিনি তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোন করে রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর খবর জানান।

অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর সামরিক আদালত এ মামলায় একাধিক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে রায় কার্যকরের আগেই মোজাফফর ও তার এক সহযোগী সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যান।

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ভারতে অবস্থানকালে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়ে জীবনযাপন শুরু করেন। জাল কাগজপত্র ও ভুয়া পরিচয়ের মাধ্যমে বিদেশ ভ্রমণও করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন প্রকৃত পরিচয় গোপন থাকায় তাকে খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

পরবর্তীতে তিনি গোপনে বাংলাদেশে ফিরে বনানী ডিওএইচএস এলাকায় বসবাস শুরু করেন। নিজেকে রাজনীতি থেকে দূরে থাকা একজন সাধারণ প্রবীণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যেও তার সম্পর্কে কোনো সন্দেহ তৈরি হয়নি।

গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, মোজাফফর হোসেন কোর্ট মার্শালে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরবর্তী কার্যক্রম সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় পরিচালিত হবে।

দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদনে বর্ণিত অভিযোগগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মামলার নথিতে উল্লেখিত তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে উল্লিখিত অভিযোগ আদালতের বিচারিক নথির অংশ।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

৪৫ বছর পলাতক থাকার পর ধরা পড়লেন জিয়া হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মোজাফফর, মেয়ের সূত্র আর জন্মদাগেই শেষ পর্যন্ত শনাক্ত

আপডেট সময় ১০:৪৯:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

সাড়ে চার দশক ধরে আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন। নিজের পরিচয় গোপন রাখতে নাম-পরিচয়, জীবনযাপন এমনকি চেহারার পরিবর্তন করেও শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে পারেননি তিনি। গোয়েন্দাদের দীর্ঘ নজরদারি, মেয়ের কর্মস্থল থেকে পাওয়া তথ্য এবং নাকের নিচের একটি জন্মদাগই তাকে শনাক্ত করার প্রধান সূত্র হয়ে ওঠে।

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, মোজাফফরের মেয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। কয়েক মাস ধরে তার চলাফেরা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দারা বনানী ডিওএইচএসের একটি বাসা চিহ্নিত করেন। এরপর সাধারণ পোশাকে ওই এলাকায় গোপন নজরদারি চালিয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হয়।

গত বুধবার গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে গোয়েন্দারা নিজেদের মেয়ের অফিসের কর্মী পরিচয় দিয়ে বাসার দরজায় যান। দরজা খুলে এক বৃদ্ধ ব্যক্তি বাইরে এলে কর্মকর্তারা তার মুখাবয়ব পর্যবেক্ষণ করেন। নাকের নিচে থাকা একটি পরিচিত জন্মদাগ দেখে সন্দেহ আরও জোরালো হয়। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজেই বলেন, “আমি মোজাফফর, মেয়ের বাবা।” এই স্বীকারোক্তির পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে মোজাফফর হোসেনের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, তিনি ও আরেক সেনা কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির কক্ষে পৌঁছে তাকে বাইরে নিয়ে আসেন এবং গুলি চালানো হয়। পরে তিনি তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোন করে রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর খবর জানান।

অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর সামরিক আদালত এ মামলায় একাধিক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে রায় কার্যকরের আগেই মোজাফফর ও তার এক সহযোগী সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যান।

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ভারতে অবস্থানকালে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়ে জীবনযাপন শুরু করেন। জাল কাগজপত্র ও ভুয়া পরিচয়ের মাধ্যমে বিদেশ ভ্রমণও করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন প্রকৃত পরিচয় গোপন থাকায় তাকে খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

পরবর্তীতে তিনি গোপনে বাংলাদেশে ফিরে বনানী ডিওএইচএস এলাকায় বসবাস শুরু করেন। নিজেকে রাজনীতি থেকে দূরে থাকা একজন সাধারণ প্রবীণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যেও তার সম্পর্কে কোনো সন্দেহ তৈরি হয়নি।

গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, মোজাফফর হোসেন কোর্ট মার্শালে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরবর্তী কার্যক্রম সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় পরিচালিত হবে।

দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদনে বর্ণিত অভিযোগগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মামলার নথিতে উল্লেখিত তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে উল্লিখিত অভিযোগ আদালতের বিচারিক নথির অংশ।