ঢাকা ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হামে ভয়াবহ পরিস্থিতি: সংক্রমণে বিশ্বের শীর্ষে বাংলাদেশ, ঝুঁকিতে হাজারো শিশু

নিজস্ব সংবাদ :

বাংলাদেশে একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে থাকা হাম (Measles) রোগ আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চলতি বছরে হামের সংক্রমণে বিশ্বের সব দেশকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। দ্রুত বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, আর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে টিকা না পাওয়া শিশুরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সর্বশেষ নজরদারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে বাংলাদেশে ৪২ হাজারেরও বেশি হাম বা হামসদৃশ উপসর্গের রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এত বেশি রোগী পাওয়া যায়নি। তালিকায় বাংলাদেশের পরেই রয়েছে ভারত, এরপর ইয়েমেন, মেক্সিকো ও পাকিস্তান।

কেন এত দ্রুত বাড়ছে হাম?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় কারণ টিকাদানে বড় ধরনের ঘাটতি। একসময় বাংলাদেশে হাম প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী—

  • নিয়মিত টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
  • অনেক শিশু নির্ধারিত দুই ডোজ টিকার একটিও পায়নি।
  • বিভিন্ন এলাকায় টিকার সরবরাহেও ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।
  • এর ফলে শিশুদের মধ্যে “ইমিউনিটি গ্যাপ” তৈরি হয়েছে, যা বড় প্রাদুর্ভাবের পথ তৈরি করেছে।

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে মৃত্যুর সংখ্যা

দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত লাখের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ সময় শত শত শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম বা হামজনিত জটিলতায়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চূড়ান্ত বৈশ্বিক হিসাবেও বাংলাদেশ মৃত্যুর সংখ্যায় শীর্ষ দেশগুলোর একটি হতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা?

বিশ্লেষণে দেখা গেছে—

  • এক বছরের কম বয়সী আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশ কোনো টিকাই পায়নি।
  • ১ থেকে ৯ বছর বয়সী বহু শিশুও প্রয়োজনীয় দুই ডোজ টিকা সম্পূর্ণ করেনি।
  • হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত অধিকাংশ শিশুই টিকাবঞ্চিত ছিল।

হার্ড ইমিউনিটি এখন বড় চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত অন্যকে সংক্রমিত করতে পারেন। এ কারণে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে না পারলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

যদিও সরকার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে, তারপরও লাখ লাখ শিশু এখনো টিকার বাইরে রয়ে গেছে বলে বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এতে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এখনই প্রয়োজন—

  • টিকাবঞ্চিত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা।
  • নিয়মিত ও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা।
  • অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি।
  • দেশের প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—যদি দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ না করা যায়, তাহলে হামের বর্তমান সংকট আরও বড় জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

 

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

হামে ভয়াবহ পরিস্থিতি: সংক্রমণে বিশ্বের শীর্ষে বাংলাদেশ, ঝুঁকিতে হাজারো শিশু

আপডেট সময় ০২:২৬:৫৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশে একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে থাকা হাম (Measles) রোগ আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চলতি বছরে হামের সংক্রমণে বিশ্বের সব দেশকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। দ্রুত বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, আর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে টিকা না পাওয়া শিশুরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সর্বশেষ নজরদারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে বাংলাদেশে ৪২ হাজারেরও বেশি হাম বা হামসদৃশ উপসর্গের রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এত বেশি রোগী পাওয়া যায়নি। তালিকায় বাংলাদেশের পরেই রয়েছে ভারত, এরপর ইয়েমেন, মেক্সিকো ও পাকিস্তান।

কেন এত দ্রুত বাড়ছে হাম?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় কারণ টিকাদানে বড় ধরনের ঘাটতি। একসময় বাংলাদেশে হাম প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী—

  • নিয়মিত টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
  • অনেক শিশু নির্ধারিত দুই ডোজ টিকার একটিও পায়নি।
  • বিভিন্ন এলাকায় টিকার সরবরাহেও ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।
  • এর ফলে শিশুদের মধ্যে “ইমিউনিটি গ্যাপ” তৈরি হয়েছে, যা বড় প্রাদুর্ভাবের পথ তৈরি করেছে।

উদ্বেগ বাড়াচ্ছে মৃত্যুর সংখ্যা

দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত লাখের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ সময় শত শত শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম বা হামজনিত জটিলতায়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চূড়ান্ত বৈশ্বিক হিসাবেও বাংলাদেশ মৃত্যুর সংখ্যায় শীর্ষ দেশগুলোর একটি হতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা?

বিশ্লেষণে দেখা গেছে—

  • এক বছরের কম বয়সী আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশ কোনো টিকাই পায়নি।
  • ১ থেকে ৯ বছর বয়সী বহু শিশুও প্রয়োজনীয় দুই ডোজ টিকা সম্পূর্ণ করেনি।
  • হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত অধিকাংশ শিশুই টিকাবঞ্চিত ছিল।

হার্ড ইমিউনিটি এখন বড় চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত অন্যকে সংক্রমিত করতে পারেন। এ কারণে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে না পারলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

যদিও সরকার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে, তারপরও লাখ লাখ শিশু এখনো টিকার বাইরে রয়ে গেছে বলে বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এতে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এখনই প্রয়োজন—

  • টিকাবঞ্চিত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা।
  • নিয়মিত ও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা।
  • অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি।
  • দেশের প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—যদি দ্রুত টিকাদানের ঘাটতি পূরণ না করা যায়, তাহলে হামের বর্তমান সংকট আরও বড় জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।