সিকৃবিতে অত্যাধুনিক প্ল্যান্ট হেলথ ক্লিনিকের যাত্রা শুরু
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিকৃবি) অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ প্ল্যান্ট হেলথ ক্লিনিকের যাত্রা শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে উদ্ভিদের রোগ শনাক্তকরণ, আধুনিক গবেষণা, শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শিক্ষা এবং কৃষকদের ফসলের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত পরামর্শ সেবা প্রদানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের চতুর্থ তলায় ক্লিনিকটির উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফি উল্যাহ মজুমদার।
উচ্চশিক্ষা ত্বরান্বিতকরণ ও রূপান্তর (হিট) প্রকল্পের আওতায় উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব ও বীজ বিজ্ঞান বিভাগের ‘এনহ্যান্সিং দ্য প্ল্যান্ট হেলথ ক্লিনিক ইন দ্য ডিপার্টমেন্ট অব প্ল্যান্ট প্যাথলজি অ্যান্ড সিড সায়েন্স ফর কাটিং-এজ রিসার্চ, কোয়ালিটি এডুকেশন অ্যান্ড স্ট্রেনদেন্ড আউটরিচ অ্যাক্টিভিটিজ’ শীর্ষক উপ-প্রকল্পের মাধ্যমে ক্লিনিকটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
উদ্বোধন পরবর্তী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফি উল্যাহ মজুমদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এ.টি.এম. মাহবুব-ই-এলাহী ও কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব ও বীজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আসাদ-উদ-দৌল্লাহ। উপ-প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনিরুল ইসলাম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফি উল্যাহ মজুমদার বলেন, “প্রথমেই আমি এই প্রকল্পের উদ্যোগ গ্রহণকারী এবং সংশ্লিষ্ট টিমের সদস্যদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তারা অত্যন্ত সুন্দরভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে এই গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই গবেষণাগারের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন এর গবেষণার ফলাফল এ অঞ্চলের কৃষকদের কাজে লাগবে। এর মাধ্যমে আমরা এমন গবেষণা চাই, যেখান থেকে ব্যবহারযোগ্য পেটেন্ট, উন্নত জাত ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি তৈরি হবে, যা এ অঞ্চলের বাস্তব সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখবে।”
এ সময় তিনি আরো বলেন, “আমাদের গবেষণার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বিদ্যমান গবেষণার ঘাটতি এবং মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো শনাক্ত করে সমস্যা সমাধানে অ্যাকশন-বেইজড গবেষণা পরিকল্পনা প্রণয়ন করে আরো বেশি সংখ্যক গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা। আমার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য যেখানে যেতে হয় আমি যাব, প্রয়োজনে মাঠ পর্যায়ে গিয়েও কৃষকদের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করব । এই বিষয়ে কে কি বলল আমি কেয়ার করি না,আমার দরকার কাজ করা। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন দক্ষ, উদ্ভাবনী ও মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে, যারা দেশ ও সমাজের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হবে।” এ সময় তিনি ল্যাব মেম্বারদের গবেষণা পরিবর্তিত বিভিন্ন যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের কথা তুলে ধরেন এবং দ্রুত ল্যাব টেকনিশিয়ান দেওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করেন।
উপ-প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব ও বীজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, “এই প্ল্যান্ট হেলথ ক্লিনিকের মাধ্যমে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিক্ষা লাভ করতে পারবে। পাশাপাশি স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থী এবং গবেষকেরা গবেষণার সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে এ অঞ্চলের কৃষকেরা ফসলের বিভিন্ন সমস্যা শনাক্তকরণসহ উদ্ভিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাসংক্রান্ত যেকোনো পরামর্শ এখান থেকে নিতে পারবেন।” দেশের টেকসই উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং কৃষক পর্যায়ে কার্যকর সম্প্রসারণসেবা নিশ্চিত করতে ক্লিনিকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ক্লিনিকটিতে আধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে উদ্ভিদের রোগ শনাক্তকরণ ও গবেষণার কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষতিকর অণুজীব, যেমন ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস এবং সংক্রামক পদার্থ নিয়ে নিরাপদে কাজ করার জন্য বায়োসেফটি ক্যাবিনেট। উদ্ভিদের পাতায় ক্লোরোফিলের পরিমাণ ও সবুজতার মাত্রা পরিমাপ এবং নাইট্রোজেনের ঘাটতি নির্ণয়ের জন্য রয়েছে এসপিএডি ক্লোরোফিল মিটার।
এছাড়া, ব্যাকটেরিয়া, ইস্ট, ছত্রাকসহ বিভিন্ন অণুজীবের চাষ ও বৃদ্ধির জন্য মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ইনকিউবেটর, নমুনা পর্যবেক্ষণের জন্য উন্নত প্রযুক্তির মাইক্রোস্কোপ, বিশুদ্ধ পানি তৈরির জন্য ওয়াটার ডিস্টিলেশন প্ল্যান্ট এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও গবেষণায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরির জন্য প্ল্যান্ট গ্রোথ চেম্বার রয়েছে।
ক্লিনিকটিতে আরো রয়েছে পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (পিসিআর) মেশিন, রিয়েল-টাইম পিসিআর মেশিন, মাইনাস ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় নমুনা সংরক্ষণের জন্য আল্ট্রা-লো টেম্পারেচার (ইউএলটি) ফ্রিজার এবং ল্যাবরেটরি রেফ্রিজারেটরসহ বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি। এসব সরঞ্জাম উদ্ভিদের রোগ শনাক্তকরণ, রোগজীবাণু নিয়ে গবেষণা, নমুনা সংরক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের কাজে ব্যবহৃত হবে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই প্ল্যান্ট হেলথ ক্লিনিকের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান আরো উন্নত হবে। পাশাপাশি কৃষকদের ফসলের রোগ ও অন্যান্য সমস্যা শনাক্ত করে কার্যকর পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতেও ক্লিনিকটি ভূমিকা রাখবে।

























