ঢাকা ০৯:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অনিয়মিত বৃষ্টিতেও রংপুরে আমনের বাম্পার ফলনের আশা, কৃষকের মুখে হাসি

নিজস্ব সংবাদ :

রংপুর প্রতিনিধি

বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের তুলনায় কম ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে শুরুতে কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন রংপুর অঞ্চলের আমনচাষিরা। তবে সেচের ব্যবস্থা, অনুকূল মাটির আর্দ্রতা এবং সময়মতো পরিচর্যায় সেই শঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে। এখন মাঠজুড়ে সবুজ ও সোনালি ধানের সমারোহ। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মৌসুমে এ অঞ্চলে আমনের বাম্পার ফলন হতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বাসসকে জানান, এবার বৃষ্টিপাত কম হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়ায় আমন ধানের গাছ ভালোভাবে বেড়ে উঠেছে। মৌসুমের বিভিন্ন সময়ে হওয়া বৃষ্টিও ফসলের বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকায় ধানগাছের বর্তমান অবস্থা সন্তোষজনক। ফসল কাটার আগ পর্যন্ত বৃষ্টিপাত কম হলেও ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উঁচু জমিতে দেরিতে রোপণ করা ধানখেতে প্রয়োজনমতো আরও এক-দুবার সেচ দেওয়া গেলে উৎপাদন বাড়তে পারে।

লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে চাষ

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলে ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল ২০ লাখ ৫ হাজার ২৮ টন চাল, যা ধানের হিসাবে ৩০ লাখ ৭ হাজার ৫৪২ টন।

প্রাথমিক পর্যায়ে পানির সংকটসহ নানা প্রতিকূলতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কৃষকেরা ৬ লাখ ২১ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আমন ধান রোপণ করেছেন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪০ হেক্টর বেশি জমিতে এবার এ ধানের আবাদ হয়েছে।

রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলায় আমন ধানের আবাদ পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। এর মধ্যে ১ লাখ ১৩ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে চাষ হয়েছে স্বল্পমেয়াদি আমন ধান।

ধান কাটায় ব্যস্ত কৃষক, বাড়ছে নতুন চালের সরবরাহ

স্বল্পমেয়াদি আমন ধান কাটার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত ২০ হাজার ৪৩৬ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। এসব জমি থেকে পাওয়া গেছে ৬৪ হাজার ৯৭৩ টন চাল, যা ধানের হিসাবে ৯৭ হাজার ৪৬০ টন।

আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি আমন ধান কাটার কাজ শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, মৌসুমের প্রধান অংশের ধান কাটার কার্যক্রম আগামী মাস থেকে পুরোদমে শুরু হতে পারে।

বর্তমানে এ অঞ্চলের বিভিন্ন মাঠে ধানের নানা পর্যায়ের চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোথাও ধানে ফুল এসেছে, কোথাও দানা গঠিত হচ্ছে, আবার কিছু জমিতে ধান পাকার অপেক্ষায় রয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ৩৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ জমির ধানে ফুল এসেছে এবং ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ জমির ধান রয়েছে থোড় আসার পর্যায়ে। ইতোমধ্যে ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে।

ভালো ফলনের আশায় নবান্নের প্রস্তুতি

ধানের সম্ভাব্য ভালো ফলনের পাশাপাশি নতুন ধানের বাজারমূল্যও কৃষকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে। গ্রামীণ জনপদে নতুন ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতির সঙ্গে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসবের আমেজ।

রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার কৃষক মফিজার রহমান, বাবুল হোসেন, সোলায়মান আলী ও বদিউল ইসলাম জানান, স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের ফলন নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট। পরিচর্যা ও সেচের কারণে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও ভালো ফলনের আশা করছেন তাঁরা।

রংপুর সদর উপজেলার কাঠিহারা গ্রামের কৃষক আলহাজ ইসহাক আলী জানান, আগামী মাস থেকে তাঁর জমির আমন ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, এবার তাঁদের এলাকার কৃষকেরা প্রতি একর জমিতে সর্বোচ্চ ৫০ মণ পর্যন্ত ধান পেতে পারেন।

পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে ফসল সুরক্ষা

এবার আমন চাষে শুধু সেচ ও পরিচর্যার ওপর নির্ভর করেননি কৃষকেরা। জমিতে জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন তাঁরা। এর মধ্যে রয়েছে পার্চিং পদ্ধতি, যেখানে জমিতে ডালপালা পুঁতে পাখির বসার ব্যবস্থা করা হয়, এবং পোকা আকৃষ্ট করে ধরার জন্য লাইট ট্র্যাপ বা আলোর ফাঁদ ব্যবহার।

কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম জানান, মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পুরো অঞ্চলে আমন ধানের আবাদ সফলভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।

সব মিলিয়ে, মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও এখন রংপুর অঞ্চলের কৃষকদের প্রত্যাশা অনেকটাই বেড়েছে। অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে এবং ধান কাটা পর্যন্ত ফসলের বড় ধরনের ক্ষতি না হলে এবার আমনের ভালো ফলন কৃষকের ঘরে স্বস্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসতে পারে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

অনিয়মিত বৃষ্টিতেও রংপুরে আমনের বাম্পার ফলনের আশা, কৃষকের মুখে হাসি

আপডেট সময় ০২:৪৩:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

রংপুর প্রতিনিধি

বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের তুলনায় কম ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে শুরুতে কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন রংপুর অঞ্চলের আমনচাষিরা। তবে সেচের ব্যবস্থা, অনুকূল মাটির আর্দ্রতা এবং সময়মতো পরিচর্যায় সেই শঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে। এখন মাঠজুড়ে সবুজ ও সোনালি ধানের সমারোহ। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মৌসুমে এ অঞ্চলে আমনের বাম্পার ফলন হতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বাসসকে জানান, এবার বৃষ্টিপাত কম হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়ায় আমন ধানের গাছ ভালোভাবে বেড়ে উঠেছে। মৌসুমের বিভিন্ন সময়ে হওয়া বৃষ্টিও ফসলের বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকায় ধানগাছের বর্তমান অবস্থা সন্তোষজনক। ফসল কাটার আগ পর্যন্ত বৃষ্টিপাত কম হলেও ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উঁচু জমিতে দেরিতে রোপণ করা ধানখেতে প্রয়োজনমতো আরও এক-দুবার সেচ দেওয়া গেলে উৎপাদন বাড়তে পারে।

লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে চাষ

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলে ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল ২০ লাখ ৫ হাজার ২৮ টন চাল, যা ধানের হিসাবে ৩০ লাখ ৭ হাজার ৫৪২ টন।

প্রাথমিক পর্যায়ে পানির সংকটসহ নানা প্রতিকূলতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কৃষকেরা ৬ লাখ ২১ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আমন ধান রোপণ করেছেন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪০ হেক্টর বেশি জমিতে এবার এ ধানের আবাদ হয়েছে।

রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলায় আমন ধানের আবাদ পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। এর মধ্যে ১ লাখ ১৩ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে চাষ হয়েছে স্বল্পমেয়াদি আমন ধান।

ধান কাটায় ব্যস্ত কৃষক, বাড়ছে নতুন চালের সরবরাহ

স্বল্পমেয়াদি আমন ধান কাটার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত ২০ হাজার ৪৩৬ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। এসব জমি থেকে পাওয়া গেছে ৬৪ হাজার ৯৭৩ টন চাল, যা ধানের হিসাবে ৯৭ হাজার ৪৬০ টন।

আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি আমন ধান কাটার কাজ শেষ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, মৌসুমের প্রধান অংশের ধান কাটার কার্যক্রম আগামী মাস থেকে পুরোদমে শুরু হতে পারে।

বর্তমানে এ অঞ্চলের বিভিন্ন মাঠে ধানের নানা পর্যায়ের চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোথাও ধানে ফুল এসেছে, কোথাও দানা গঠিত হচ্ছে, আবার কিছু জমিতে ধান পাকার অপেক্ষায় রয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ৩৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ জমির ধানে ফুল এসেছে এবং ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ জমির ধান রয়েছে থোড় আসার পর্যায়ে। ইতোমধ্যে ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে।

ভালো ফলনের আশায় নবান্নের প্রস্তুতি

ধানের সম্ভাব্য ভালো ফলনের পাশাপাশি নতুন ধানের বাজারমূল্যও কৃষকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে। গ্রামীণ জনপদে নতুন ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতির সঙ্গে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসবের আমেজ।

রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার কৃষক মফিজার রহমান, বাবুল হোসেন, সোলায়মান আলী ও বদিউল ইসলাম জানান, স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের ফলন নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট। পরিচর্যা ও সেচের কারণে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও ভালো ফলনের আশা করছেন তাঁরা।

রংপুর সদর উপজেলার কাঠিহারা গ্রামের কৃষক আলহাজ ইসহাক আলী জানান, আগামী মাস থেকে তাঁর জমির আমন ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, এবার তাঁদের এলাকার কৃষকেরা প্রতি একর জমিতে সর্বোচ্চ ৫০ মণ পর্যন্ত ধান পেতে পারেন।

পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে ফসল সুরক্ষা

এবার আমন চাষে শুধু সেচ ও পরিচর্যার ওপর নির্ভর করেননি কৃষকেরা। জমিতে জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন তাঁরা। এর মধ্যে রয়েছে পার্চিং পদ্ধতি, যেখানে জমিতে ডালপালা পুঁতে পাখির বসার ব্যবস্থা করা হয়, এবং পোকা আকৃষ্ট করে ধরার জন্য লাইট ট্র্যাপ বা আলোর ফাঁদ ব্যবহার।

কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম জানান, মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পুরো অঞ্চলে আমন ধানের আবাদ সফলভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।

সব মিলিয়ে, মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও এখন রংপুর অঞ্চলের কৃষকদের প্রত্যাশা অনেকটাই বেড়েছে। অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে এবং ধান কাটা পর্যন্ত ফসলের বড় ধরনের ক্ষতি না হলে এবার আমনের ভালো ফলন কৃষকের ঘরে স্বস্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসতে পারে।