ঢাকা ০১:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিল্লিকে স্পষ্ট বার্তা ঢাকার: সম্পর্ক এগোতে চাইলে চাই ‘সহায়ক পরিবেশ’

নিজস্ব সংবাদ :

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা ভারতকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে ঢাকা। সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাতে এ বার্তা দেওয়া হয়।

সাক্ষাৎ শেষে দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি জানান, দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক ধারায় এগিয়ে নিতে একটি ‘ইনেবলিং এনভায়রনমেন্ট’ বা সহায়ক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—বাংলাদেশ সেই বিষয়টিকেই গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে।

হাসিনা প্রত্যর্পণে আবারও অনুরোধ

ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজনদেরও দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তিনি জানান, ভারত যে অতিরিক্ত নথিপত্র চেয়েছিল, বাংলাদেশ সেগুলো সরবরাহ করেছে। হাদি হত্যাকাণ্ডকে ‘অত্যন্ত স্পর্শকাতর’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ভারতকে গুরুত্বসহকারে অনুরোধ করা হয়েছে।

সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন প্রসঙ্গও উঠেছে

দুই দেশের আলোচনায় সীমান্ত হত্যা ও অবৈধ পুশ-ইনের বিষয়ও এসেছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে তিনি বলেন, এগুলো মূলত কারিগরি ও প্রশাসনিক পর্যায়ের বিষয়; তাই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে তা সংক্ষিপ্তভাবে আলোচিত হয়েছে। এ বিষয়ে আগের দিন তাঁর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের পৃথক বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

৫ আগস্টের ঘটনার বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত

গত বছরের ৫ আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের কাছে বাংলাদেশের পাঠানো অসন্তোষপত্রের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ তার অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে এবং ভারতীয় পক্ষ সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের আদালত শেখ হাসিনাকে দণ্ডিত করেছে। ফলে বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তকে সম্মান করা প্রত্যেক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাঁর ভাষায়, দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির বক্তব্য আদালতের মাধ্যমেই উপস্থাপিত হওয়া উচিত।

‘বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে খাটো করা উচিত নয়’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘটনাকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি অসম্মানজনক হিসেবে দেখছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোনো স্তম্ভ—বিশেষ করে বিচার বিভাগ—খাটো করার মতো পরিস্থিতি ভারত সৃষ্টি করবে না।

তাঁর দাবি, ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় তিনি এমন ইঙ্গিত পেয়েছেন যে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।

দিল্লি সফর নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন। জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

তিনি স্পষ্ট করেন, প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকস সম্মেলনের জন্য নয়, বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠনের দিনই একটি শুভেচ্ছা ও আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি।

তবে ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে সোমবারের বৈঠকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তমূলক আলোচনা হয়নি বলে নিশ্চিত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

কূটনৈতিক বার্তায় নতুন ইঙ্গিত

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে টানাপোড়েনের আভাস দেখা যাচ্ছিল, সোমবারের এই বৈঠক সেই প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একদিকে সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে, অন্যদিকে বিচারব্যবস্থা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও প্রত্যর্পণের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থানও স্পষ্ট করা হয়েছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

দিল্লিকে স্পষ্ট বার্তা ঢাকার: সম্পর্ক এগোতে চাইলে চাই ‘সহায়ক পরিবেশ’

আপডেট সময় ০১:১১:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা ভারতকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে ঢাকা। সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাতে এ বার্তা দেওয়া হয়।

সাক্ষাৎ শেষে দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি জানান, দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক ধারায় এগিয়ে নিতে একটি ‘ইনেবলিং এনভায়রনমেন্ট’ বা সহায়ক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—বাংলাদেশ সেই বিষয়টিকেই গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে।

হাসিনা প্রত্যর্পণে আবারও অনুরোধ

ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজনদেরও দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তিনি জানান, ভারত যে অতিরিক্ত নথিপত্র চেয়েছিল, বাংলাদেশ সেগুলো সরবরাহ করেছে। হাদি হত্যাকাণ্ডকে ‘অত্যন্ত স্পর্শকাতর’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ভারতকে গুরুত্বসহকারে অনুরোধ করা হয়েছে।

সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন প্রসঙ্গও উঠেছে

দুই দেশের আলোচনায় সীমান্ত হত্যা ও অবৈধ পুশ-ইনের বিষয়ও এসেছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে তিনি বলেন, এগুলো মূলত কারিগরি ও প্রশাসনিক পর্যায়ের বিষয়; তাই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে তা সংক্ষিপ্তভাবে আলোচিত হয়েছে। এ বিষয়ে আগের দিন তাঁর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের পৃথক বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

৫ আগস্টের ঘটনার বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত

গত বছরের ৫ আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের কাছে বাংলাদেশের পাঠানো অসন্তোষপত্রের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ তার অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে এবং ভারতীয় পক্ষ সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের আদালত শেখ হাসিনাকে দণ্ডিত করেছে। ফলে বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তকে সম্মান করা প্রত্যেক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাঁর ভাষায়, দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির বক্তব্য আদালতের মাধ্যমেই উপস্থাপিত হওয়া উচিত।

‘বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে খাটো করা উচিত নয়’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘটনাকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি অসম্মানজনক হিসেবে দেখছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোনো স্তম্ভ—বিশেষ করে বিচার বিভাগ—খাটো করার মতো পরিস্থিতি ভারত সৃষ্টি করবে না।

তাঁর দাবি, ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় তিনি এমন ইঙ্গিত পেয়েছেন যে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।

দিল্লি সফর নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন। জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

তিনি স্পষ্ট করেন, প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকস সম্মেলনের জন্য নয়, বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠনের দিনই একটি শুভেচ্ছা ও আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি।

তবে ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে সোমবারের বৈঠকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তমূলক আলোচনা হয়নি বলে নিশ্চিত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

কূটনৈতিক বার্তায় নতুন ইঙ্গিত

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে টানাপোড়েনের আভাস দেখা যাচ্ছিল, সোমবারের এই বৈঠক সেই প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একদিকে সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে, অন্যদিকে বিচারব্যবস্থা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও প্রত্যর্পণের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থানও স্পষ্ট করা হয়েছে।