ঢাকা ০৮:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঘরে ঘরে জ্বর, একসঙ্গে ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু-হাম-চিকুনগুনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জা

নিজস্ব সংবাদ :

দেশজুড়ে জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, হাম ও ইনফ্লুয়েঞ্জার পাশাপাশি রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস (আরএসভি)সহ বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণও একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই জ্বর, শরীরে র‍্যাশ, কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের নানা উপসর্গ নিয়ে রোগী আসছেন।

চিকিৎসকরা বলছেন, একই ধরনের জ্বর হলেও এর পেছনে একাধিক রোগ থাকতে পারে। ফলে রোগের ধরন নিশ্চিত করতে অনেক ক্ষেত্রেই একাধিক পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এতে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। আবার পরীক্ষার ফল পাওয়ার আগে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা শুরু করাও চিকিৎসকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের ভিড় বেড়েছে। শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগেও জ্বর নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা সুলতানা বেগম তার দুই বছরের ছেলে আরাফকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। তিনি জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে শিশুটির মাঝে মাঝেই জ্বর আসছে। ডেঙ্গু বা হাম হয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হাসপাতালে এসেছেন তিনি।

শুধু আরাফ নয়, হাসপাতালের বহির্বিভাগে একই পরিস্থিতিতে অপেক্ষা করতে দেখা যায় অনেক অভিভাবককে। তাদের কয়েকজন জানান, পরিবারের একাধিক সদস্য একই সময়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। ঘরোয়া চিকিৎসা ও সাধারণ ওষুধে জ্বর না কমায় তারা হাসপাতালে আসতে বাধ্য হয়েছেন।

পুরান ঢাকার আরেক বাসিন্দা হিমেল চৌধুরী বলেন, তার পরিবারের পাঁচ সদস্যের মধ্যে তিনজন জ্বরে আক্রান্ত। তিনি যে ছয়তলা ভবনে থাকেন, সেখানকার প্রায় প্রতিটি ফ্ল্যাটেই একজন বা একাধিক ব্যক্তি জ্বরে ভুগছেন। ওষুধ খাওয়ার পরও জ্বর পুরোপুরি না কমায় আতঙ্ক বাড়ছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে নির্দিষ্ট সময়ে মেডিসিন বহির্বিভাগে গড়ে প্রায় ২৫০ রোগী আসতেন, বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চিকিৎসকদের কাছে আসা শিশুদের বড় অংশের জ্বরের সঙ্গে র‍্যাশ, ডায়রিয়া কিংবা শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গ রয়েছে।

হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, কিছু শিশুর ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হলেও তাদের উপসর্গ ডেঙ্গুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আবার অনেকের ক্ষেত্রে অন্য ভাইরাসের উপস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো হচ্ছে। প্রতিদিন বহির্বিভাগে আসা রোগীদের একটি অংশকে শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বর হলেই সেটিকে সাধারণ মৌসুমি অসুস্থতা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ডেঙ্গুতে জ্বরের সঙ্গে তীব্র শরীর ও চোখের পেছনে ব্যথা, মাথাব্যথা, দুর্বলতা কিংবা র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে হামের ক্ষেত্রে জ্বরের পর শরীরে র‍্যাশ দেখা দিয়ে তা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জায় হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া বা নাক বন্ধ হওয়ার মতো উপসর্গ বেশি থাকে।

চিকুনগুনিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তীব্র জয়েন্ট বা শরীরের বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতে ব্যথা। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এই ব্যথা জ্বর সেরে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন থাকতে পারে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে আবার রক্তক্ষরণ ও শকে যাওয়ার মতো জটিলতার আশঙ্কা থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে হামের বড় ধরনের জটিলতার মধ্যে নিউমোনিয়াও রয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস একই সময়ে সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। এর মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। ইনফ্লুয়েঞ্জার এ ও বি—দুই ধরনের ভাইরাসই পাওয়া যাচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, বর্তমানে জ্বরের ধরন আগের তুলনায় জটিল হয়ে উঠেছে। ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর সঙ্গে হাম ও চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণও দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগীর জ্বর কমে গেলেও দীর্ঘ সময় ধরে শরীরের ব্যথা ও দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, জ্বর হলেই নিজের মতো করে ওষুধ শুরু করা কিংবা ইন্টারনেট দেখে চিকিৎসা নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ার পর হাসপাতালে এলে অনেক সময় চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। তাই জ্বরের ধরন ও অন্যান্য উপসর্গ বিবেচনায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

এদিকে জ্বরের প্রকোপের সঙ্গে দেশে হামের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৫৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।

চলতি বছর নিশ্চিত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা মিলিয়ে প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১ হাজার ৪৩ জন রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছেন। এর মধ্যে ৯৫৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৪৮ জন। নিশ্চিত হামের রোগী ১৯ হাজার ৬৯৬ জন। বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ১৬৮ জন।

অন্যদিকে, ডেঙ্গুতেও পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ১ হাজার ৫৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা চলতি বছরের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে চারজনের।

নতুন রোগী নিয়ে চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৫৯০ জনে। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১১৭ জনের। মৃতদের মধ্যে ৬৪ জন নারী ও ৫২ জন পুরুষ। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়।

মাসভিত্তিক হিসাবেও ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। জুনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে সেই সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ২০৬ জনে দাঁড়ায়। আগস্টে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতেই হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৭৪৪ জনে পৌঁছেছে।

সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জ্বরকে অবহেলা না করে রোগীর বয়স, উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং আগে থেকেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ঘরে ঘরে জ্বর, একসঙ্গে ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু-হাম-চিকুনগুনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জা

আপডেট সময় ০২:৫৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশজুড়ে জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, হাম ও ইনফ্লুয়েঞ্জার পাশাপাশি রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস (আরএসভি)সহ বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণও একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই জ্বর, শরীরে র‍্যাশ, কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের নানা উপসর্গ নিয়ে রোগী আসছেন।

চিকিৎসকরা বলছেন, একই ধরনের জ্বর হলেও এর পেছনে একাধিক রোগ থাকতে পারে। ফলে রোগের ধরন নিশ্চিত করতে অনেক ক্ষেত্রেই একাধিক পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এতে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। আবার পরীক্ষার ফল পাওয়ার আগে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা শুরু করাও চিকিৎসকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের ভিড় বেড়েছে। শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগেও জ্বর নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাসিন্দা সুলতানা বেগম তার দুই বছরের ছেলে আরাফকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। তিনি জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে শিশুটির মাঝে মাঝেই জ্বর আসছে। ডেঙ্গু বা হাম হয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হাসপাতালে এসেছেন তিনি।

শুধু আরাফ নয়, হাসপাতালের বহির্বিভাগে একই পরিস্থিতিতে অপেক্ষা করতে দেখা যায় অনেক অভিভাবককে। তাদের কয়েকজন জানান, পরিবারের একাধিক সদস্য একই সময়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। ঘরোয়া চিকিৎসা ও সাধারণ ওষুধে জ্বর না কমায় তারা হাসপাতালে আসতে বাধ্য হয়েছেন।

পুরান ঢাকার আরেক বাসিন্দা হিমেল চৌধুরী বলেন, তার পরিবারের পাঁচ সদস্যের মধ্যে তিনজন জ্বরে আক্রান্ত। তিনি যে ছয়তলা ভবনে থাকেন, সেখানকার প্রায় প্রতিটি ফ্ল্যাটেই একজন বা একাধিক ব্যক্তি জ্বরে ভুগছেন। ওষুধ খাওয়ার পরও জ্বর পুরোপুরি না কমায় আতঙ্ক বাড়ছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে নির্দিষ্ট সময়ে মেডিসিন বহির্বিভাগে গড়ে প্রায় ২৫০ রোগী আসতেন, বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চিকিৎসকদের কাছে আসা শিশুদের বড় অংশের জ্বরের সঙ্গে র‍্যাশ, ডায়রিয়া কিংবা শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গ রয়েছে।

হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, কিছু শিশুর ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হলেও তাদের উপসর্গ ডেঙ্গুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আবার অনেকের ক্ষেত্রে অন্য ভাইরাসের উপস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো হচ্ছে। প্রতিদিন বহির্বিভাগে আসা রোগীদের একটি অংশকে শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বর হলেই সেটিকে সাধারণ মৌসুমি অসুস্থতা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। ডেঙ্গুতে জ্বরের সঙ্গে তীব্র শরীর ও চোখের পেছনে ব্যথা, মাথাব্যথা, দুর্বলতা কিংবা র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে হামের ক্ষেত্রে জ্বরের পর শরীরে র‍্যাশ দেখা দিয়ে তা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইনফ্লুয়েঞ্জায় হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া বা নাক বন্ধ হওয়ার মতো উপসর্গ বেশি থাকে।

চিকুনগুনিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তীব্র জয়েন্ট বা শরীরের বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতে ব্যথা। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এই ব্যথা জ্বর সেরে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন থাকতে পারে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে আবার রক্তক্ষরণ ও শকে যাওয়ার মতো জটিলতার আশঙ্কা থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে হামের বড় ধরনের জটিলতার মধ্যে নিউমোনিয়াও রয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস একই সময়ে সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। এর মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। ইনফ্লুয়েঞ্জার এ ও বি—দুই ধরনের ভাইরাসই পাওয়া যাচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, বর্তমানে জ্বরের ধরন আগের তুলনায় জটিল হয়ে উঠেছে। ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর সঙ্গে হাম ও চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণও দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগীর জ্বর কমে গেলেও দীর্ঘ সময় ধরে শরীরের ব্যথা ও দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, জ্বর হলেই নিজের মতো করে ওষুধ শুরু করা কিংবা ইন্টারনেট দেখে চিকিৎসা নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ার পর হাসপাতালে এলে অনেক সময় চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। তাই জ্বরের ধরন ও অন্যান্য উপসর্গ বিবেচনায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

এদিকে জ্বরের প্রকোপের সঙ্গে দেশে হামের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৫৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।

চলতি বছর নিশ্চিত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা মিলিয়ে প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১ হাজার ৪৩ জন রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছেন। এর মধ্যে ৯৫৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৪ হাজার ১৪৮ জন। নিশ্চিত হামের রোগী ১৯ হাজার ৬৯৬ জন। বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ১৬৮ জন।

অন্যদিকে, ডেঙ্গুতেও পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ১ হাজার ৫৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা চলতি বছরের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে চারজনের।

নতুন রোগী নিয়ে চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৫৯০ জনে। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১১৭ জনের। মৃতদের মধ্যে ৬৪ জন নারী ও ৫২ জন পুরুষ। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়।

মাসভিত্তিক হিসাবেও ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। জুনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে সেই সংখ্যা বেড়ে ৯ হাজার ২০৬ জনে দাঁড়ায়। আগস্টে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতেই হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৭৪৪ জনে পৌঁছেছে।

সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জ্বরকে অবহেলা না করে রোগীর বয়স, উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং আগে থেকেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।