ঢাকা ০১:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রথম ১৮০ দিনে অর্থনীতিতে স্বস্তি, তবে বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানে কাটেনি ধীরগতি

নিজস্ব সংবাদ :

নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১৮০ দিনে দেশের বৈদেশিক খাতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়। রপ্তানিতেও এসেছে সাময়িক গতি। জুলাইয়ের বিভিন্ন সূচকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার আভাস মিললেও বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে এখনো প্রত্যাশিত গতি ফেরেনি। তবে আমদানি বাড়ার প্রবণতাকে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘ বিরতির পর ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা জানিয়েছিল। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান তৈরি এবং বন্ধ ও লোকসানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফেরানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সরকারের প্রথম ছয় মাসে সামগ্রিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে সেই প্রভাব খুব বেশি দৃশ্যমান হয়নি। উৎপাদন ও রপ্তানিতে কিছুটা গতি থাকলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখনো শিল্প খাতের জন্য বড় বাধা হয়ে আছে। এর মধ্যেই আমদানি বাড়ার প্রবণতা অর্থনীতিতে নতুন কার্যক্রমের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

তবে মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও নতুন কারখানা স্থাপনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানিতে এখনো উল্লেখযোগ্য গতি দেখা যায়নি। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধিও নেমে এসেছে দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। গত বছরের জুলাইয়ে যেখানে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ শতাংশের বেশি, এক বছরের ব্যবধানে তা অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, অর্থনীতির পরিধি বাড়লে সরকারের রাজস্বভিত্তিও শক্তিশালী হবে। এজন্য শুধু সাময়িক পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার।

অন্যদিকে আমদানি বৃদ্ধির কারণে বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ঘাটতি প্রায় ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রবাসী আয় বাড়লেও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে এখনো পুরোপুরি স্বস্তি ফিরে আসেনি।

শিল্প খাতেও বড় ধরনের নতুন বিনিয়োগের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। গত ছয় মাসে নতুন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর সংখ্যা কম। বরং কোথাও উৎপাদন বন্ধ, কোথাও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। নির্মাণ খাতেও এসেছে সংকোচন। ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরাও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। নতুন উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানির মতো ব্যয়বহুল ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়াতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং রপ্তানিতে সাময়িক গতি অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি এনেছে। কিন্তু বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্প উৎপাদনের গতি এখনো মন্থর।

সামনের দিনে সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে বৈদেশিক খাতে তৈরি হওয়া স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো। বিশেষ করে শিল্পে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কার্যকর সংস্কার এবং বাস্তবভিত্তিক নীতি গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

প্রথম ১৮০ দিনে অর্থনীতিতে স্বস্তি, তবে বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানে কাটেনি ধীরগতি

আপডেট সময় ০৩:০১:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১৮০ দিনে দেশের বৈদেশিক খাতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়। রপ্তানিতেও এসেছে সাময়িক গতি। জুলাইয়ের বিভিন্ন সূচকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার আভাস মিললেও বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে এখনো প্রত্যাশিত গতি ফেরেনি। তবে আমদানি বাড়ার প্রবণতাকে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘ বিরতির পর ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা জানিয়েছিল। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান তৈরি এবং বন্ধ ও লোকসানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফেরানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সরকারের প্রথম ছয় মাসে সামগ্রিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে সেই প্রভাব খুব বেশি দৃশ্যমান হয়নি। উৎপাদন ও রপ্তানিতে কিছুটা গতি থাকলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখনো শিল্প খাতের জন্য বড় বাধা হয়ে আছে। এর মধ্যেই আমদানি বাড়ার প্রবণতা অর্থনীতিতে নতুন কার্যক্রমের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

তবে মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও নতুন কারখানা স্থাপনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানিতে এখনো উল্লেখযোগ্য গতি দেখা যায়নি। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধিও নেমে এসেছে দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। গত বছরের জুলাইয়ে যেখানে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ শতাংশের বেশি, এক বছরের ব্যবধানে তা অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, অর্থনীতির পরিধি বাড়লে সরকারের রাজস্বভিত্তিও শক্তিশালী হবে। এজন্য শুধু সাময়িক পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার।

অন্যদিকে আমদানি বৃদ্ধির কারণে বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ঘাটতি প্রায় ২৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রবাসী আয় বাড়লেও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে এখনো পুরোপুরি স্বস্তি ফিরে আসেনি।

শিল্প খাতেও বড় ধরনের নতুন বিনিয়োগের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। গত ছয় মাসে নতুন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর সংখ্যা কম। বরং কোথাও উৎপাদন বন্ধ, কোথাও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। নির্মাণ খাতেও এসেছে সংকোচন। ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরাও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। নতুন উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানির মতো ব্যয়বহুল ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়াতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং রপ্তানিতে সাময়িক গতি অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি এনেছে। কিন্তু বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্প উৎপাদনের গতি এখনো মন্থর।

সামনের দিনে সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে বৈদেশিক খাতে তৈরি হওয়া স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো। বিশেষ করে শিল্পে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কার্যকর সংস্কার এবং বাস্তবভিত্তিক নীতি গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।