ঢাকা ০১:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদির আগুনে পুড়ল স্বপ্ন: নওগাঁর ১২ প্রবাসীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া, ঋণের বোঝায় দিশেহারা পরিবার

নিজস্ব সংবাদ :

নিজস্ব প্রতিবেদন

ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় চার বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ। বিদেশ যাওয়ার খরচ জোগাতে পরিবারের এক শতাংশ জমি বিক্রি করতে হয়েছিল। বড় বোনেরা ধারদেনা করেছিলেন এই আশায় যে, ফরিদ প্রবাসে গিয়ে উপার্জন করে সব ঋণ শোধ করবেন, সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবেন এবং দুই সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করবেন।

কিন্তু সেই স্বপ্ন ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ডে থেমে গেল। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে প্রাণ হারান ফরিদ। ওই ঘটনায় মোট ১৬ জন নিহত হন, যার মধ্যে ১২ জনই নওগাঁ জেলার বাসিন্দা। তাদের ১১ জনের বাড়ি আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে।

কান্নায় ভেঙে পড়েছে ফরিদের পরিবার

ফরিদের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছানোর পর থেকেই তার বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। স্ত্রী সুখি বেগমের সামনে এখন একদিকে স্বামী হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ঋণের চাপ। দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবে সেই ঋণ পরিশোধ হবে—কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি।

ফরিদ ছিলেন চার বোনের পর পরিবারের একমাত্র ছেলে। তার ওপরই নির্ভর করতেন পরিবারের সদস্যরা। সংসারে রয়েছেন দুই মা, স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে। আর্থিক সংকট কাটাতেই তাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল।

একই শোক নেমে এসেছে বহু ঘরে

ফরিদের মতো অন্য নিহতদের পরিবারেও চলছে একই দৃশ্য। কেউ চার বছর, কেউ ছয় বা আট বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করছিলেন। আবার কেউ মাত্র কয়েক মাস আগে জীবিকার সন্ধানে সেখানে গিয়েছিলেন।

আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, স্বজন হারানোর শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে পুরো এলাকা। অনেক পরিবারই তাদের প্রবাসী সদস্যের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সেই উপার্জনের পথ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা এখন গভীর আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

নিহতদের পরিচয়

আত্রাই উপজেলা প্রশাসনের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী নিহতদের মধ্যে রয়েছেন—

  • গন্ডগোহালী গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন আলীসুমন
  • একই গ্রামের রুবেল প্রামাণিক
  • কলিমউদ্দিন
  • ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা ওরফে সুমন
  • হাসিবুল হাসান
  • সাধনগর গ্রামের সাগর আলী
  • মাধবপুর গ্রামের মজিদুল সরদার সজীব
  • পারকাসুন্দা গ্রামের জলিল সরদার
  • মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক
  • নওগাঁ সদর উপজেলার পার-নওগাঁ এলাকার শাহীন, যিনি মাত্র পাঁচ মাস আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন।

মরদেহ ফেরত ও সহায়তার দাবি

স্থানীয়দের দাবি, নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা, ঋণ পরিশোধে সহযোগিতা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

অনেক পরিবার জমি বিক্রি বা সুদে টাকা ধার করে স্বজনদের বিদেশে পাঠিয়েছিল। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের হারিয়ে তারা এখন চরম সংকটে পড়েছে।

প্রশাসনের আশ্বাস

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান নিহতদের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সমবেদনা জানিয়েছেন এবং খোঁজখবর নিয়েছেন।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিহত প্রবাসীদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে ঢাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহায়তা বরাদ্দ এলে তা যথাযথভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসনও সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা করার চেষ্টা করবে।

স্বপ্ন ভাঙার পর বেঁচে থাকার লড়াই

যে মানুষগুলো পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে বিদেশে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই ফিরছেন লাশ হয়ে। প্রিয়জন হারানোর শোকের পাশাপাশি এখন শুরু হয়েছে নতুন এক সংগ্রাম—বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

নওগাঁর এসব পরিবার আজ অপেক্ষা করছে দুটি বিষয়ের জন্য: কখন শেষবারের মতো প্রিয়জনকে দেখতে পাবে, আর কখন রাষ্ট্র তাদের এই অসহায় সময়ে পাশে দাঁড়াবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

সৌদির আগুনে পুড়ল স্বপ্ন: নওগাঁর ১২ প্রবাসীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া, ঋণের বোঝায় দিশেহারা পরিবার

আপডেট সময় ০৩:৫৩:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদন

ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় চার বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ। বিদেশ যাওয়ার খরচ জোগাতে পরিবারের এক শতাংশ জমি বিক্রি করতে হয়েছিল। বড় বোনেরা ধারদেনা করেছিলেন এই আশায় যে, ফরিদ প্রবাসে গিয়ে উপার্জন করে সব ঋণ শোধ করবেন, সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবেন এবং দুই সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করবেন।

কিন্তু সেই স্বপ্ন ভয়াবহ এক অগ্নিকাণ্ডে থেমে গেল। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে প্রাণ হারান ফরিদ। ওই ঘটনায় মোট ১৬ জন নিহত হন, যার মধ্যে ১২ জনই নওগাঁ জেলার বাসিন্দা। তাদের ১১ জনের বাড়ি আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে।

কান্নায় ভেঙে পড়েছে ফরিদের পরিবার

ফরিদের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছানোর পর থেকেই তার বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। স্ত্রী সুখি বেগমের সামনে এখন একদিকে স্বামী হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ঋণের চাপ। দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবে সেই ঋণ পরিশোধ হবে—কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি।

ফরিদ ছিলেন চার বোনের পর পরিবারের একমাত্র ছেলে। তার ওপরই নির্ভর করতেন পরিবারের সদস্যরা। সংসারে রয়েছেন দুই মা, স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে। আর্থিক সংকট কাটাতেই তাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল।

একই শোক নেমে এসেছে বহু ঘরে

ফরিদের মতো অন্য নিহতদের পরিবারেও চলছে একই দৃশ্য। কেউ চার বছর, কেউ ছয় বা আট বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করছিলেন। আবার কেউ মাত্র কয়েক মাস আগে জীবিকার সন্ধানে সেখানে গিয়েছিলেন।

আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, স্বজন হারানোর শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে পুরো এলাকা। অনেক পরিবারই তাদের প্রবাসী সদস্যের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সেই উপার্জনের পথ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা এখন গভীর আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

নিহতদের পরিচয়

আত্রাই উপজেলা প্রশাসনের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী নিহতদের মধ্যে রয়েছেন—

  • গন্ডগোহালী গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন আলীসুমন
  • একই গ্রামের রুবেল প্রামাণিক
  • কলিমউদ্দিন
  • ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা ওরফে সুমন
  • হাসিবুল হাসান
  • সাধনগর গ্রামের সাগর আলী
  • মাধবপুর গ্রামের মজিদুল সরদার সজীব
  • পারকাসুন্দা গ্রামের জলিল সরদার
  • মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক
  • নওগাঁ সদর উপজেলার পার-নওগাঁ এলাকার শাহীন, যিনি মাত্র পাঁচ মাস আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন।

মরদেহ ফেরত ও সহায়তার দাবি

স্থানীয়দের দাবি, নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা, ঋণ পরিশোধে সহযোগিতা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

অনেক পরিবার জমি বিক্রি বা সুদে টাকা ধার করে স্বজনদের বিদেশে পাঠিয়েছিল। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের হারিয়ে তারা এখন চরম সংকটে পড়েছে।

প্রশাসনের আশ্বাস

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান নিহতদের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সমবেদনা জানিয়েছেন এবং খোঁজখবর নিয়েছেন।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিহত প্রবাসীদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে ঢাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহায়তা বরাদ্দ এলে তা যথাযথভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসনও সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা করার চেষ্টা করবে।

স্বপ্ন ভাঙার পর বেঁচে থাকার লড়াই

যে মানুষগুলো পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে বিদেশে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই ফিরছেন লাশ হয়ে। প্রিয়জন হারানোর শোকের পাশাপাশি এখন শুরু হয়েছে নতুন এক সংগ্রাম—বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

নওগাঁর এসব পরিবার আজ অপেক্ষা করছে দুটি বিষয়ের জন্য: কখন শেষবারের মতো প্রিয়জনকে দেখতে পাবে, আর কখন রাষ্ট্র তাদের এই অসহায় সময়ে পাশে দাঁড়াবে।