ঢাকা ১২:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাধ্যতামূলক শ্রমের অভিযোগে বাংলাদেশের পণ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক, ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে ৬০ দেশ চাপে

নিজস্ব সংবাদ :

যুক্তরাষ্ট্র আবারও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। বাধ্যতামূলক শ্রম প্রতিরোধে যথেষ্ট ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন আমদানি শুল্ক আরোপ করছে ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন এই শুল্ক শুক্রবার (২৪ জুলাই) থেকে কার্যকর হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি গেজেট ফেডারেল রেজিস্টার-এ প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দেশভেদে ১০ শতাংশ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ পণ্য কোনো না কোনোভাবে নতুন শুল্কনীতির আওতায় আসবে।

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া ও মেক্সিকোর পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্কের সঙ্গে সমন্বয় করে মোট ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কার্যকর হবে। এছাড়া চীনসহ আরও ৩৮টি দেশের পণ্যে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে।

এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় জরুরি ক্ষমতার আওতায় আরোপ করা ট্রাম্প প্রশাসনের ‘পারস্পরিক শুল্ক’ বাতিল করে দেয়। পরে সরকার ১৫০ দিনের জন্য একটি অস্থায়ী ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছিল, যার মেয়াদ শুক্রবার শেষ হচ্ছে। সেই শুল্কের পরিবর্তে এবার ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার অধীনে নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারায় নেওয়া সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা তুলনামূলক কঠিন।

তবে সব ধরনের পণ্য নতুন শুল্কের আওতায় পড়ছে না। তেল-গ্যাস, সার, নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যপণ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিধানের আওতাভুক্ত গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামার মতো পণ্য ছাড় পাচ্ছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তির (USMCA) শর্ত পূরণকারী পণ্যও শুল্কমুক্ত থাকবে। বর্তমানে যেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রগামী পথে রয়েছে, সেগুলো আগামী ২৮ জুলাই পর্যন্ত নতুন শুল্ক থেকে অব্যাহতি পাবে।

এই সিদ্ধান্তের পর বিভিন্ন দেশ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। নরওয়ে বলেছে, তাদের দেশে বাধ্যতামূলক শ্রম রোধে কঠোর আইন কার্যকর থাকায় এমন শুল্কের কোনো যৌক্তিকতা নেই। অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলও সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে কানাডা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

ম্যাসাচুসেটসের গভর্নর মাউরা হিলির মতে, নতুন শুল্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ব্যয় বাড়বে এবং ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রির বলেছেন, দেশটিতে প্রায় একশ বছর ধরে বাধ্যতামূলক শ্রম নিষিদ্ধ এবং সেই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদেরও একই মানদণ্ড অনুসরণ করা উচিত।

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই পদক্ষেপ শুধু বাণিজ্য নয়, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধ্যতামূলক শ্রমের ব্যবহার কমানো এবং শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যেও নেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মানবাধিকার ইস্যুর পাশাপাশি এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর বাণিজ্য কৌশলেরও অংশ। বিশেষ করে চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর মুসলিমদের জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর অবস্থান নিয়ে আসছে। নতুন শুল্কনীতিকে সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ধারাবাহিক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বাধ্যতামূলক শ্রমের অভিযোগে বাংলাদেশের পণ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক, ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে ৬০ দেশ চাপে

আপডেট সময় ০৫:২২:১১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র আবারও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। বাধ্যতামূলক শ্রম প্রতিরোধে যথেষ্ট ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন আমদানি শুল্ক আরোপ করছে ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন এই শুল্ক শুক্রবার (২৪ জুলাই) থেকে কার্যকর হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি গেজেট ফেডারেল রেজিস্টার-এ প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দেশভেদে ১০ শতাংশ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ পণ্য কোনো না কোনোভাবে নতুন শুল্কনীতির আওতায় আসবে।

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া ও মেক্সিকোর পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্কের সঙ্গে সমন্বয় করে মোট ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কার্যকর হবে। এছাড়া চীনসহ আরও ৩৮টি দেশের পণ্যে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে।

এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় জরুরি ক্ষমতার আওতায় আরোপ করা ট্রাম্প প্রশাসনের ‘পারস্পরিক শুল্ক’ বাতিল করে দেয়। পরে সরকার ১৫০ দিনের জন্য একটি অস্থায়ী ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছিল, যার মেয়াদ শুক্রবার শেষ হচ্ছে। সেই শুল্কের পরিবর্তে এবার ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার অধীনে নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারায় নেওয়া সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা তুলনামূলক কঠিন।

তবে সব ধরনের পণ্য নতুন শুল্কের আওতায় পড়ছে না। তেল-গ্যাস, সার, নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যপণ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিধানের আওতাভুক্ত গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামার মতো পণ্য ছাড় পাচ্ছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তির (USMCA) শর্ত পূরণকারী পণ্যও শুল্কমুক্ত থাকবে। বর্তমানে যেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রগামী পথে রয়েছে, সেগুলো আগামী ২৮ জুলাই পর্যন্ত নতুন শুল্ক থেকে অব্যাহতি পাবে।

এই সিদ্ধান্তের পর বিভিন্ন দেশ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। নরওয়ে বলেছে, তাদের দেশে বাধ্যতামূলক শ্রম রোধে কঠোর আইন কার্যকর থাকায় এমন শুল্কের কোনো যৌক্তিকতা নেই। অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলও সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে কানাডা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।

ম্যাসাচুসেটসের গভর্নর মাউরা হিলির মতে, নতুন শুল্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ব্যয় বাড়বে এবং ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রির বলেছেন, দেশটিতে প্রায় একশ বছর ধরে বাধ্যতামূলক শ্রম নিষিদ্ধ এবং সেই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদেরও একই মানদণ্ড অনুসরণ করা উচিত।

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই পদক্ষেপ শুধু বাণিজ্য নয়, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধ্যতামূলক শ্রমের ব্যবহার কমানো এবং শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যেও নেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মানবাধিকার ইস্যুর পাশাপাশি এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর বাণিজ্য কৌশলেরও অংশ। বিশেষ করে চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর মুসলিমদের জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর অবস্থান নিয়ে আসছে। নতুন শুল্কনীতিকে সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ধারাবাহিক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।