ঢাকা ০৫:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডা. জুবাইদা রহমান: বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট লেডি’ ধারণায় কি শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়?

নিজস্ব সংবাদ :

বাংলাদেশের সংবিধানে ‘ফার্স্ট লেডি’ নামে কোনো সাংবিধানিক পদ নেই। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণীকেই এই পরিচয়ে দেখা হয়, আর প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী পরিচিত হন ‘স্পাউস অব দ্য প্রাইম মিনিস্টার’ হিসেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি নাম নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে—ডা. জুবাইদা রহমান

তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ফার্স্ট লেডি নন, তবুও দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার উপস্থিতি এবং ভূমিকা অনেকের কাছে তাকে কার্যত সেই মর্যাদার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশে কি বদলে যাচ্ছে ‘ফার্স্ট লেডি’র প্রচলিত ধারণা?

আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন পরিচিতি

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মার্কিন ফার্স্ট লেডির আমন্ত্রণে অংশ নেন ডা. জুবাইদা রহমান। সেখানে তিনি শিশুস্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়ন নিয়ে বক্তব্য রাখেন। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে তার এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকে নতুন মাত্রা দেয় এবং তাকে ঘিরে জনমনে নতুন আগ্রহের জন্ম দেয়।

শুধু রাজনৈতিক পরিচয় নয়, রয়েছে নিজস্ব অর্জন

ডা. জুবাইদা রহমানের পরিচয় শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। সরকারি স্বাস্থ্য ক্যাডারেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

এই পেশাগত পরিচয় তাকে প্রচলিত রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের তুলনায় আলাদা অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।

পারিবারিক ঐতিহ্য: নেতৃত্ব, রাজনীতি ও কূটনীতির উত্তরাধিকার

ডা. জুবাইদা রহমান এমন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনা, সামরিক নেতৃত্ব, আইন, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। তার পারিবারিক ইতিহাসে একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের নাম জড়িয়ে আছে, যা তাকে ছোটবেলা থেকেই নেতৃত্ব ও জনসেবার পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়।

তার বাবা রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান ছিলেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান। সামরিক জীবনের পাশাপাশি তিনি পরবর্তীতে সরকারের যোগাযোগমন্ত্রীকৃষিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

তার দাদা আহমেদ আলী খান ১৯০১ সালে ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করেন। তিনি ছিলেন আসাম প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভাপতি এবং তৎকালীন ভারতের আইন পরিষদের (Legislative Council) সদস্য।

পরিবারের আরেক বিশিষ্ট সদস্য আজমল আলী চৌধুরী, যিনি পাকিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম বিচারপতি সৈয়দ আমির আলী ছিলেন ডা. জুবাইদা রহমানের পূর্বপুরুষদের একজন, যা তার পরিবারের ঐতিহাসিক মর্যাদাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

তার পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশের আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন তার চাচা। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানীও পারিবারিকভাবে তার আত্মীয় ছিলেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও রয়েছে তার পরিবারের শক্তিশালী উপস্থিতি। বিশ্বখ্যাত মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর সাবেক মহাসচিব আইরিন খান তার চাচাতো বোন। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও মানবাধিকার অঙ্গনে আইরিন খানের ভূমিকা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ডা. জুবাইদা রহমানের পরিবারে সামরিক নেতৃত্ব, আইন, রাজনীতি, প্রশাসন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার—সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। ফলে নেতৃত্ব, জনসেবা ও রাষ্ট্রচিন্তার যে উত্তরাধিকার, তা তার পারিবারিক পরিবেশেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ডা. জুবাইদা রহমান: বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট লেডি’ ধারণায় কি শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়?

আপডেট সময় ০৪:০২:৩০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের সংবিধানে ‘ফার্স্ট লেডি’ নামে কোনো সাংবিধানিক পদ নেই। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণীকেই এই পরিচয়ে দেখা হয়, আর প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী পরিচিত হন ‘স্পাউস অব দ্য প্রাইম মিনিস্টার’ হিসেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি নাম নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে—ডা. জুবাইদা রহমান

তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ফার্স্ট লেডি নন, তবুও দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার উপস্থিতি এবং ভূমিকা অনেকের কাছে তাকে কার্যত সেই মর্যাদার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশে কি বদলে যাচ্ছে ‘ফার্স্ট লেডি’র প্রচলিত ধারণা?

আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন পরিচিতি

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মার্কিন ফার্স্ট লেডির আমন্ত্রণে অংশ নেন ডা. জুবাইদা রহমান। সেখানে তিনি শিশুস্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়ন নিয়ে বক্তব্য রাখেন। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে তার এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকে নতুন মাত্রা দেয় এবং তাকে ঘিরে জনমনে নতুন আগ্রহের জন্ম দেয়।

শুধু রাজনৈতিক পরিচয় নয়, রয়েছে নিজস্ব অর্জন

ডা. জুবাইদা রহমানের পরিচয় শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। সরকারি স্বাস্থ্য ক্যাডারেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

এই পেশাগত পরিচয় তাকে প্রচলিত রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের তুলনায় আলাদা অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।

পারিবারিক ঐতিহ্য: নেতৃত্ব, রাজনীতি ও কূটনীতির উত্তরাধিকার

ডা. জুবাইদা রহমান এমন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনা, সামরিক নেতৃত্ব, আইন, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। তার পারিবারিক ইতিহাসে একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের নাম জড়িয়ে আছে, যা তাকে ছোটবেলা থেকেই নেতৃত্ব ও জনসেবার পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়।

তার বাবা রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান ছিলেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান। সামরিক জীবনের পাশাপাশি তিনি পরবর্তীতে সরকারের যোগাযোগমন্ত্রীকৃষিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

তার দাদা আহমেদ আলী খান ১৯০১ সালে ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করেন। তিনি ছিলেন আসাম প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভাপতি এবং তৎকালীন ভারতের আইন পরিষদের (Legislative Council) সদস্য।

পরিবারের আরেক বিশিষ্ট সদস্য আজমল আলী চৌধুরী, যিনি পাকিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম বিচারপতি সৈয়দ আমির আলী ছিলেন ডা. জুবাইদা রহমানের পূর্বপুরুষদের একজন, যা তার পরিবারের ঐতিহাসিক মর্যাদাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

তার পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশের আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন তার চাচা। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানীও পারিবারিকভাবে তার আত্মীয় ছিলেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও রয়েছে তার পরিবারের শক্তিশালী উপস্থিতি। বিশ্বখ্যাত মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর সাবেক মহাসচিব আইরিন খান তার চাচাতো বোন। আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও মানবাধিকার অঙ্গনে আইরিন খানের ভূমিকা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ডা. জুবাইদা রহমানের পরিবারে সামরিক নেতৃত্ব, আইন, রাজনীতি, প্রশাসন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার—সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। ফলে নেতৃত্ব, জনসেবা ও রাষ্ট্রচিন্তার যে উত্তরাধিকার, তা তার পারিবারিক পরিবেশেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।