ঢাকা ০৮:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই, শোকাহত সাংস্কৃতিক অঙ্গন

নিজস্ব সংবাদ :

দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘদিন নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার (২৯ জুন) সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

পারিবারিক সূত্র জানায়, তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী, শুভানুধ্যায়ী ও স্বজন রেখে গেছেন। শিল্পীর সহকারী রুবেল মিয়া জানান, সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুর খবর জানায়।

গত ১৪ জুন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। চিকিৎসার একপর্যায়ে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে নেওয়ায় আশার সঞ্চার হলেও পরে শারীরিক অবস্থার আবারও অবনতি ঘটলে পুনরায় ভেন্টিলেটরে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তার স্ত্রী মেরী মনোয়ার জানিয়েছিলেন, ফুসফুসে গুরুতর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের কারণে তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। শিল্প, সাহিত্য, টেলিভিশন, শিশুতোষ অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতি বিকাশে দীর্ঘ কয়েক দশকের নিরলস অবদানের মাধ্যমে তিনি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছান। সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।

জলরঙে ছবি আঁকায় মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন বিশেষভাবে সমাদৃত। কলকাতা আর্ট কলেজে অধ্যয়নকালে তার শিল্পকর্ম প্রশংসিত হয়। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তার আঁকার সরল অথচ গভীর প্রকাশভঙ্গির প্রশংসা করেছিলেন।

শিল্পচর্চার পাশাপাশি নাটক, সংগীত ও সংস্কৃতি আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। ভাষা আন্দোলনের সময় ছাত্রাবস্থায় রাজনৈতিক কার্টুন আঁকার দায়ে কারাবরণ করেছিলেন। এই অভিজ্ঞতাই তার মধ্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা তৈরি করে।

আর্ট কলেজের শিক্ষা শেষ করে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে ১৯৬০ সালে ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দিয়ে বাংলা সংস্কৃতিকে টেলিভিশনের মাধ্যমে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

বাংলাদেশে পাপেট শিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রেও মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান অনস্বীকার্য। তার সৃষ্ট জনপ্রিয় পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ পরবর্তীকালে ইউনিসেফের বহুল পরিচিত শিশু চরিত্র ‘মীনা’ তৈরির অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’র অন্যতম রূপকার ছিলেন তিনি। টেলিভিশন নাটক নির্মাণেও তার সৃজনশীলতা দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে।

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, সহকর্মী, শিল্পী ও শুভানুধ্যায়ীরা তার অবদানের কথা স্মরণ করে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, তার প্রয়াণে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গন এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারাল।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই, শোকাহত সাংস্কৃতিক অঙ্গন

আপডেট সময় ০৫:৫০:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘদিন নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার (২৯ জুন) সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

পারিবারিক সূত্র জানায়, তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী, শুভানুধ্যায়ী ও স্বজন রেখে গেছেন। শিল্পীর সহকারী রুবেল মিয়া জানান, সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুর খবর জানায়।

গত ১৪ জুন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। চিকিৎসার একপর্যায়ে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে নেওয়ায় আশার সঞ্চার হলেও পরে শারীরিক অবস্থার আবারও অবনতি ঘটলে পুনরায় ভেন্টিলেটরে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তার স্ত্রী মেরী মনোয়ার জানিয়েছিলেন, ফুসফুসে গুরুতর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের কারণে তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। শিল্প, সাহিত্য, টেলিভিশন, শিশুতোষ অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতি বিকাশে দীর্ঘ কয়েক দশকের নিরলস অবদানের মাধ্যমে তিনি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছান। সেই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।

জলরঙে ছবি আঁকায় মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন বিশেষভাবে সমাদৃত। কলকাতা আর্ট কলেজে অধ্যয়নকালে তার শিল্পকর্ম প্রশংসিত হয়। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তার আঁকার সরল অথচ গভীর প্রকাশভঙ্গির প্রশংসা করেছিলেন।

শিল্পচর্চার পাশাপাশি নাটক, সংগীত ও সংস্কৃতি আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। ভাষা আন্দোলনের সময় ছাত্রাবস্থায় রাজনৈতিক কার্টুন আঁকার দায়ে কারাবরণ করেছিলেন। এই অভিজ্ঞতাই তার মধ্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা তৈরি করে।

আর্ট কলেজের শিক্ষা শেষ করে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে ১৯৬০ সালে ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দিয়ে বাংলা সংস্কৃতিকে টেলিভিশনের মাধ্যমে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

বাংলাদেশে পাপেট শিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রেও মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান অনস্বীকার্য। তার সৃষ্ট জনপ্রিয় পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ পরবর্তীকালে ইউনিসেফের বহুল পরিচিত শিশু চরিত্র ‘মীনা’ তৈরির অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’র অন্যতম রূপকার ছিলেন তিনি। টেলিভিশন নাটক নির্মাণেও তার সৃজনশীলতা দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে।

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, সহকর্মী, শিল্পী ও শুভানুধ্যায়ীরা তার অবদানের কথা স্মরণ করে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, তার প্রয়াণে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গন এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারাল।