ঢাকা ০২:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্মার্ট চশমায় গোপনে নারীর ভিডিও, ভাইরাল হওয়ার পর মেটার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ

নিজস্ব সংবাদ :

মেটার তৈরি ‘রে-ব্যান মেটা’ স্মার্ট চশমা ব্যবহার করে নারীদের অজান্তে ভিডিও ধারণ এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের অভিযোগ নতুন করে গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভারতের কলকাতায় এমনই এক ঘটনায় মেটার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকাতার ৩৫ বছর বয়সী অধ্যাপক ইয়ামিনি গত জুনে সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরছিলেন। রাত সোয়া ৮টার দিকে তুলনামূলক নির্জন একটি এলাকায় এক অপরিচিত ব্যক্তি তার সামনে এসে কথা বলেন। ওই ব্যক্তি জানান, দূর থেকে ইয়ামিনিকে তার ‘কিউট’ মনে হয়েছে। অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এড়াতে সংক্ষিপ্তভাবে কথা বলে সেখান থেকে চলে যান ইয়ামিনি।

তবে ওই সময় তিনি বুঝতে পারেননি, তার সঙ্গে হওয়া পুরো কথোপকথন স্মার্ট চশমায় ধারণ করা হচ্ছে।

পরদিন এক শিক্ষার্থীর মাধ্যমে ইয়ামিনি জানতে পারেন, তার সঙ্গে হওয়া সেই কথোপকথনের ভিডিও ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করা হয়েছে। ভিডিওটি প্রকাশকারী ব্যক্তি নিজেকে ‘পিক-আপ আর্টিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে অপরিচিত নারীদের সঙ্গে কীভাবে কথোপকথন শুরু করা যায়, তার উদাহরণ হিসেবে ঘটনাটি তুলে ধরেন।

প্রকাশের পর ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেটি ২৩ লাখেরও বেশি বার দেখা হয়।

ভিডিওটি দেখার পর ইয়ামিনি আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কারণ ভিডিওতে তিনি দেখতে পান, ওই ব্যক্তি তার সঙ্গে কথা বলার আগে কিছু সময় তাকে অনুসরণ করেছিলেন। ফলে ঘটনাটি নিছক আকস্মিক কথোপকথন ছিল না বলেই তার কাছে মনে হয়।

এ ধরনের অভিযোগ শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছর যুক্তরাজ্যের ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইসোবেল থম্পসনও অভিযোগ করেন, একজন ব্যক্তি মেটার স্মার্ট চশমা দিয়ে তাকে ধারণ করেছিলেন এবং সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের কথা জানিয়েছিলেন। ঘটনাটি তাকে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছিল বলে তিনি জানান।

ইয়ামিনির পক্ষে ভারতের ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (আইএফএফ) মেটাকে আইনি নোটিশ দিয়েছে। এতে ভিডিওটির সব কপি অপসারণ, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ও ডিভাইসের তথ্য প্রকাশ, সম্ভাব্য প্রমাণ সংরক্ষণ এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণও দাবি করা হয়েছে।

তবে মেটার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের স্মার্ট চশমায় গোপনীয়তা সুরক্ষার জন্য একটি দৃশ্যমান এলইডি নির্দেশক রয়েছে। চশমা দিয়ে ছবি বা ভিডিও ধারণের সময় সেটি জ্বলে ওঠে এবং এটি বন্ধ করা যায় না। কেউ এলইডি ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করলে ক্যামেরা কাজ করা বন্ধ করে দেয় বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ইয়ামিনির বক্তব্য, ঘটনার সময় তিনি ওই ব্যক্তির চশমায় কোনো রেকর্ডিং লাইট দেখতে পাননি। সাধারণ দেখতে একটি চশমার মধ্যে ক্যামেরা থাকতে পারে—এমন ধারণাও তার মাথায় আসেনি।

এদিকে ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি গত জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, অপরিচিত মানুষকে হয়রানি করে এমন ভিডিও, বিশেষ করে গোপনে ধারণ করা ‘পিক-আপ লাইন’ভিত্তিক ভিডিও সরানোর বিষয়ে প্ল্যাটফর্মটি পদক্ষেপ নিচ্ছে। মেটার নীতিমালাতেও হয়রানি এবং যৌন ইঙ্গিতপূর্ণভাবে কাউকে উপস্থাপনের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ রয়েছে।

ইয়ামিনির অভিযোগের পর পুলিশের পক্ষ থেকেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যায়ভাবে বাধা দেওয়া এবং স্টকিংসহ কয়েকটি অভিযোগে মামলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবোধে। ইয়ামিনির ভাষ্য, এখন রাস্তায় কোনো অপরিচিত ব্যক্তি তার দিকে এগিয়ে এলে তার মনে প্রশ্ন জাগে—তিনি কি গোপনে ক্যামেরায় ধারণ হচ্ছেন?

তার মতে, কেউ হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রকাশ্যে ভিডিও করলে অন্তত তাকে বিষয়টি বুঝতে পারা এবং আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু স্মার্ট চশমার মতো প্রযুক্তিতে ক্যামেরা চোখের সামনে দৃশ্যমান না থাকায় সেই সুযোগ অনেকটাই কমে যায়। এতে নিজের ছবি ও ব্যক্তিগত মুহূর্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

মেটা জানিয়েছে, ইয়ামিনিকে নিয়ে তৈরি ভিডিওটি পরবর্তীতে ইনস্টাগ্রাম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা আরও জোরদার করার কাজ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ঘটনাটি আবারও সামনে এনেছে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মতি এবং জনসমক্ষে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

স্মার্ট চশমায় গোপনে নারীর ভিডিও, ভাইরাল হওয়ার পর মেটার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ

আপডেট সময় ০৩:০৮:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেটার তৈরি ‘রে-ব্যান মেটা’ স্মার্ট চশমা ব্যবহার করে নারীদের অজান্তে ভিডিও ধারণ এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের অভিযোগ নতুন করে গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভারতের কলকাতায় এমনই এক ঘটনায় মেটার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকাতার ৩৫ বছর বয়সী অধ্যাপক ইয়ামিনি গত জুনে সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরছিলেন। রাত সোয়া ৮টার দিকে তুলনামূলক নির্জন একটি এলাকায় এক অপরিচিত ব্যক্তি তার সামনে এসে কথা বলেন। ওই ব্যক্তি জানান, দূর থেকে ইয়ামিনিকে তার ‘কিউট’ মনে হয়েছে। অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এড়াতে সংক্ষিপ্তভাবে কথা বলে সেখান থেকে চলে যান ইয়ামিনি।

তবে ওই সময় তিনি বুঝতে পারেননি, তার সঙ্গে হওয়া পুরো কথোপকথন স্মার্ট চশমায় ধারণ করা হচ্ছে।

পরদিন এক শিক্ষার্থীর মাধ্যমে ইয়ামিনি জানতে পারেন, তার সঙ্গে হওয়া সেই কথোপকথনের ভিডিও ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করা হয়েছে। ভিডিওটি প্রকাশকারী ব্যক্তি নিজেকে ‘পিক-আপ আর্টিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে অপরিচিত নারীদের সঙ্গে কীভাবে কথোপকথন শুরু করা যায়, তার উদাহরণ হিসেবে ঘটনাটি তুলে ধরেন।

প্রকাশের পর ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেটি ২৩ লাখেরও বেশি বার দেখা হয়।

ভিডিওটি দেখার পর ইয়ামিনি আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কারণ ভিডিওতে তিনি দেখতে পান, ওই ব্যক্তি তার সঙ্গে কথা বলার আগে কিছু সময় তাকে অনুসরণ করেছিলেন। ফলে ঘটনাটি নিছক আকস্মিক কথোপকথন ছিল না বলেই তার কাছে মনে হয়।

এ ধরনের অভিযোগ শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছর যুক্তরাজ্যের ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইসোবেল থম্পসনও অভিযোগ করেন, একজন ব্যক্তি মেটার স্মার্ট চশমা দিয়ে তাকে ধারণ করেছিলেন এবং সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের কথা জানিয়েছিলেন। ঘটনাটি তাকে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছিল বলে তিনি জানান।

ইয়ামিনির পক্ষে ভারতের ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (আইএফএফ) মেটাকে আইনি নোটিশ দিয়েছে। এতে ভিডিওটির সব কপি অপসারণ, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ও ডিভাইসের তথ্য প্রকাশ, সম্ভাব্য প্রমাণ সংরক্ষণ এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণও দাবি করা হয়েছে।

তবে মেটার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের স্মার্ট চশমায় গোপনীয়তা সুরক্ষার জন্য একটি দৃশ্যমান এলইডি নির্দেশক রয়েছে। চশমা দিয়ে ছবি বা ভিডিও ধারণের সময় সেটি জ্বলে ওঠে এবং এটি বন্ধ করা যায় না। কেউ এলইডি ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করলে ক্যামেরা কাজ করা বন্ধ করে দেয় বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ইয়ামিনির বক্তব্য, ঘটনার সময় তিনি ওই ব্যক্তির চশমায় কোনো রেকর্ডিং লাইট দেখতে পাননি। সাধারণ দেখতে একটি চশমার মধ্যে ক্যামেরা থাকতে পারে—এমন ধারণাও তার মাথায় আসেনি।

এদিকে ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি গত জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, অপরিচিত মানুষকে হয়রানি করে এমন ভিডিও, বিশেষ করে গোপনে ধারণ করা ‘পিক-আপ লাইন’ভিত্তিক ভিডিও সরানোর বিষয়ে প্ল্যাটফর্মটি পদক্ষেপ নিচ্ছে। মেটার নীতিমালাতেও হয়রানি এবং যৌন ইঙ্গিতপূর্ণভাবে কাউকে উপস্থাপনের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ রয়েছে।

ইয়ামিনির অভিযোগের পর পুলিশের পক্ষ থেকেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যায়ভাবে বাধা দেওয়া এবং স্টকিংসহ কয়েকটি অভিযোগে মামলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবোধে। ইয়ামিনির ভাষ্য, এখন রাস্তায় কোনো অপরিচিত ব্যক্তি তার দিকে এগিয়ে এলে তার মনে প্রশ্ন জাগে—তিনি কি গোপনে ক্যামেরায় ধারণ হচ্ছেন?

তার মতে, কেউ হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রকাশ্যে ভিডিও করলে অন্তত তাকে বিষয়টি বুঝতে পারা এবং আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু স্মার্ট চশমার মতো প্রযুক্তিতে ক্যামেরা চোখের সামনে দৃশ্যমান না থাকায় সেই সুযোগ অনেকটাই কমে যায়। এতে নিজের ছবি ও ব্যক্তিগত মুহূর্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

মেটা জানিয়েছে, ইয়ামিনিকে নিয়ে তৈরি ভিডিওটি পরবর্তীতে ইনস্টাগ্রাম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা আরও জোরদার করার কাজ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ঘটনাটি আবারও সামনে এনেছে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মতি এবং জনসমক্ষে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন।