ঢাকা ০৭:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংসার চালাতেই হিমশিম, সঞ্চয়ে ভাটা: চাপে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ

নিজস্ব সংবাদ :

পণ্যমূল্য ও যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধি, কমছে ক্রয়ক্ষমতা; জিডিপির তুলনায় সঞ্চয় ও বিনিয়োগে নিম্নমুখী প্রবণতা

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম, বাড়তি পরিবহন ব্যয় এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি খরচের চাপে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একসময় মাসিক আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাজার ও সংসারের খরচের জন্য রেখে কিছু অর্থ সঞ্চয় করা সম্ভব হলেও এখন অনেক পরিবারের কাছে মাসের খরচ মেটানোই বড় চ্যালেঞ্জ। আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমে আসায় সঞ্চয়ের সুযোগ হারাচ্ছেন অনেকে। প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে বাদ পড়ছে বিনোদন, ভ্রমণ ও ভবিষ্যতের জন্য অর্থ জমানোর পরিকল্পনা।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির এই চাপ শুধু পারিবারিক বাজেটেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা দুর্বল হতে পারে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

জিডিপি বাড়লেও কমছে জাতীয় সঞ্চয়ের হার

দেশের অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে সঞ্চয়ের হার বাড়ছে না। বরং টানা তিন অর্থবছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় জাতীয় সঞ্চয়ের হার নিম্নমুখী রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল ২৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে।

অর্থাৎ তিন অর্থবছরের ব্যবধানে জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমেছে প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট। অর্থনীতির মোট আকার বাড়লেও আয়ের তুলনায় সঞ্চয় ধরে রাখার সক্ষমতা যে চাপে রয়েছে, এই পরিসংখ্যান তারই ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের মতো অপরিহার্য খাতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হওয়ায় পরিবারের হাতে বাড়তি টাকা থাকছে কম। ফলে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করার পরিবর্তে বর্তমানের প্রয়োজন মেটাতেই আয়ের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে।

ভোগের খরচ বাড়ছে, সংকুচিত হচ্ছে সঞ্চয়ের সুযোগ

বিবিএসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত তিন অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে মোট ভোগ ব্যয়ের হার ৭৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৮ দশমিক ৬২ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার বিপরীতে মোট ব্যয়ের বড় অংশই এখন ভোগের পেছনে যাচ্ছে।

তবে ভোগ ব্যয় বৃদ্ধির অর্থ এই নয় যে মানুষের জীবনযাত্রার মানও সমানভাবে উন্নত হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেলে একই পরিমাণ পণ্য কিনতেও আগের তুলনায় বেশি অর্থ প্রয়োজন হয়। ফলে বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশই অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভোগের পরিবর্তে প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে চলে যাচ্ছে।

অর্থনীতির প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত পণ্য ও সেবা থেকে অর্জিত আয়ের যে অংশ ভোগে ব্যয় না হয়ে অবশিষ্ট থাকে, তা দেশজ সঞ্চয়ের ভিত্তি। আর দেশজ সঞ্চয়ের সঙ্গে বিদেশ থেকে প্রাপ্ত নিট আয় ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক উপাদান যুক্ত হয়ে জাতীয় সঞ্চয়ের হিসাব নির্ধারিত হয়। তাই সঞ্চয়ের হার কমে যাওয়া অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অর্থায়ন সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিনিয়োগে ধীরগতি, কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ

জাতীয় সঞ্চয়ের পাশাপাশি জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হারও কমেছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ছয় বছর আগে দেশের মোট বিনিয়োগের হার ৩১ শতাংশের ওপরে থাকলেও বর্তমানে তা ২৮ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এ সময়ে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতের বিনিয়োগেই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

সঞ্চয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগে গতি না ফেরার পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, উৎপাদন সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সীমিত হতে পারে। একই সঙ্গে অর্থায়নের জন্য দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।

বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানির অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রত্যাশিত গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।

জ্বালানির দাম বাড়ায় নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের বাজারব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি করেছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়। জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতের খরচ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদরে।

বিবিএসের পরিসংখ্যান অনুসারে, আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে। টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকার পর জুলাই ও আগস্টে কিছুটা স্বস্তি মিললেও সেপ্টেম্বরে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।

জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন খরচের মধ্য দিয়ে বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে শাকসবজি, মাছ ও মাংসের মতো পণ্যের দাম বাড়লে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো বেশি চাপে পড়ে। কারণ এসব পরিবারের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ খাবার ও অন্যান্য অপরিহার্য খাতে ব্যয় হয়।

মজুরি বাড়লেও বাড়ছে না প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা

মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি মজুরি বৃদ্ধির হারও সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে কমে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হওয়ায় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতায়। আয় কিছুটা বাড়লেও যদি একই সময়ে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, বাসাভাড়া ও যাতায়াতের ব্যয় আরও বেশি হারে বাড়ে, তাহলে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হয় না। এতে পরিবারের বাজেটে ঘাটতি তৈরি হয় এবং সঞ্চয়ের জন্য অর্থ অবশিষ্ট থাকার সম্ভাবনা আরও কমে যায়।

প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে শঙ্কা, দারিদ্র্যের ঝুঁকিও বাড়ছে

অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। প্রদত্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই পূর্বাভাসে পরবর্তী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে।

প্রবৃদ্ধির গতি দুর্বল হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি উচ্চ থাকলে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত চার বছরে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন এবং প্রায় সোয়া ৬ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব শুধু সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নেই; তা মানুষের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণের সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করছে।

ঘুরে দাঁড়াতে প্রয়োজন আয়, বিনিয়োগ ও মূল্য স্থিতিশীলতা

অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, প্রকৃত আয় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বাজার তদারকি জোরদার করা, পরিবহন ব্যয়ের চাপ কমানো এবং জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়লে মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয়ের সক্ষমতাও বাড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতির চাপ কমিয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ধারায় গতি ফিরিয়ে আনা। সংসারের ব্যয় মেটাতে গিয়ে মানুষ যদি ক্রমাগত সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হন, তাহলে তার প্রভাব ভবিষ্যতে পরিবার ও অর্থনীতি—উভয় ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সাফল্য শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা স্বস্তি ফিরছে, তা দিয়েও মূল্যায়ন করতে হবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

সংসার চালাতেই হিমশিম, সঞ্চয়ে ভাটা: চাপে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ

আপডেট সময় ০৩:০৪:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

পণ্যমূল্য ও যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধি, কমছে ক্রয়ক্ষমতা; জিডিপির তুলনায় সঞ্চয় ও বিনিয়োগে নিম্নমুখী প্রবণতা

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম, বাড়তি পরিবহন ব্যয় এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি খরচের চাপে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একসময় মাসিক আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাজার ও সংসারের খরচের জন্য রেখে কিছু অর্থ সঞ্চয় করা সম্ভব হলেও এখন অনেক পরিবারের কাছে মাসের খরচ মেটানোই বড় চ্যালেঞ্জ। আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমে আসায় সঞ্চয়ের সুযোগ হারাচ্ছেন অনেকে। প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে বাদ পড়ছে বিনোদন, ভ্রমণ ও ভবিষ্যতের জন্য অর্থ জমানোর পরিকল্পনা।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির এই চাপ শুধু পারিবারিক বাজেটেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা দুর্বল হতে পারে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

জিডিপি বাড়লেও কমছে জাতীয় সঞ্চয়ের হার

দেশের অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে সঞ্চয়ের হার বাড়ছে না। বরং টানা তিন অর্থবছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় জাতীয় সঞ্চয়ের হার নিম্নমুখী রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল ২৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে।

অর্থাৎ তিন অর্থবছরের ব্যবধানে জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমেছে প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট। অর্থনীতির মোট আকার বাড়লেও আয়ের তুলনায় সঞ্চয় ধরে রাখার সক্ষমতা যে চাপে রয়েছে, এই পরিসংখ্যান তারই ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের মতো অপরিহার্য খাতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হওয়ায় পরিবারের হাতে বাড়তি টাকা থাকছে কম। ফলে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করার পরিবর্তে বর্তমানের প্রয়োজন মেটাতেই আয়ের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে।

ভোগের খরচ বাড়ছে, সংকুচিত হচ্ছে সঞ্চয়ের সুযোগ

বিবিএসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত তিন অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে মোট ভোগ ব্যয়ের হার ৭৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৮ দশমিক ৬২ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার বিপরীতে মোট ব্যয়ের বড় অংশই এখন ভোগের পেছনে যাচ্ছে।

তবে ভোগ ব্যয় বৃদ্ধির অর্থ এই নয় যে মানুষের জীবনযাত্রার মানও সমানভাবে উন্নত হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেলে একই পরিমাণ পণ্য কিনতেও আগের তুলনায় বেশি অর্থ প্রয়োজন হয়। ফলে বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশই অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভোগের পরিবর্তে প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে চলে যাচ্ছে।

অর্থনীতির প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত পণ্য ও সেবা থেকে অর্জিত আয়ের যে অংশ ভোগে ব্যয় না হয়ে অবশিষ্ট থাকে, তা দেশজ সঞ্চয়ের ভিত্তি। আর দেশজ সঞ্চয়ের সঙ্গে বিদেশ থেকে প্রাপ্ত নিট আয় ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক উপাদান যুক্ত হয়ে জাতীয় সঞ্চয়ের হিসাব নির্ধারিত হয়। তাই সঞ্চয়ের হার কমে যাওয়া অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অর্থায়ন সক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিনিয়োগে ধীরগতি, কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ

জাতীয় সঞ্চয়ের পাশাপাশি জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হারও কমেছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ছয় বছর আগে দেশের মোট বিনিয়োগের হার ৩১ শতাংশের ওপরে থাকলেও বর্তমানে তা ২৮ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এ সময়ে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতের বিনিয়োগেই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

সঞ্চয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগে গতি না ফেরার পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, উৎপাদন সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সীমিত হতে পারে। একই সঙ্গে অর্থায়নের জন্য দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।

বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানির অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রত্যাশিত গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।

জ্বালানির দাম বাড়ায় নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের বাজারব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি করেছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়। জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতের খরচ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদরে।

বিবিএসের পরিসংখ্যান অনুসারে, আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে। টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকার পর জুলাই ও আগস্টে কিছুটা স্বস্তি মিললেও সেপ্টেম্বরে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।

জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন খরচের মধ্য দিয়ে বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে শাকসবজি, মাছ ও মাংসের মতো পণ্যের দাম বাড়লে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো বেশি চাপে পড়ে। কারণ এসব পরিবারের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ খাবার ও অন্যান্য অপরিহার্য খাতে ব্যয় হয়।

মজুরি বাড়লেও বাড়ছে না প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা

মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি মজুরি বৃদ্ধির হারও সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে কমে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হওয়ায় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতায়। আয় কিছুটা বাড়লেও যদি একই সময়ে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, বাসাভাড়া ও যাতায়াতের ব্যয় আরও বেশি হারে বাড়ে, তাহলে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হয় না। এতে পরিবারের বাজেটে ঘাটতি তৈরি হয় এবং সঞ্চয়ের জন্য অর্থ অবশিষ্ট থাকার সম্ভাবনা আরও কমে যায়।

প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে শঙ্কা, দারিদ্র্যের ঝুঁকিও বাড়ছে

অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। প্রদত্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই পূর্বাভাসে পরবর্তী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে।

প্রবৃদ্ধির গতি দুর্বল হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি উচ্চ থাকলে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত চার বছরে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন এবং প্রায় সোয়া ৬ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব শুধু সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নেই; তা মানুষের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণের সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করছে।

ঘুরে দাঁড়াতে প্রয়োজন আয়, বিনিয়োগ ও মূল্য স্থিতিশীলতা

অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, প্রকৃত আয় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বাজার তদারকি জোরদার করা, পরিবহন ব্যয়ের চাপ কমানো এবং জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়লে মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয়ের সক্ষমতাও বাড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতির চাপ কমিয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ধারায় গতি ফিরিয়ে আনা। সংসারের ব্যয় মেটাতে গিয়ে মানুষ যদি ক্রমাগত সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হন, তাহলে তার প্রভাব ভবিষ্যতে পরিবার ও অর্থনীতি—উভয় ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সাফল্য শুধু প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা স্বস্তি ফিরছে, তা দিয়েও মূল্যায়ন করতে হবে।