ঢাকা ০২:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অর্থাভাবে আটকে যাচ্ছিল চিকিৎসা, সরকারি হাসপাতালে বিনা খরচে অস্ত্রোপচার

কাগজের খবর ডেস্ক:

সরকারি হাসপাতালে বিনা খরচে অস্ত্রোপচার

ফুটবল খেলতে গিয়ে হাঁটুর লিগামেন্টে আঘাত পেয়েছিল ১৬ বছরের কিশোর ইকরামুল মোল্লা। এক মাস ওষুধ খেয়েও ব্যথা না কমায় চিকিৎসার জন্য আসে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, সুস্থ হতে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। বেসরকারি ক্লিনিকে এ অস্ত্রোপচারের খরচ ধরা হয় প্রায় ২ লাখ টাকা। অসচ্ছল পরিবারের পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করা ছিল প্রায় অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের এক চিকিৎসকের উদ্যোগে সরকারি হাসপাতালেই বিনা খরচে অস্ত্রোপচার হয়েছে ইকরামুলের। এখন ধীরে ধীরে হাঁটাচলা করতে পারছে সে।

গত ৭ অক্টোবর যশোর জেনারেল হাসপাতালে ইকরামুলের হাঁটুর লিগামেন্টে অ্যাডভান্সড আর্থ্রোস্কোপিক এসিএল অস্ত্রোপচার করেন হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জন ডা. এস কে রাজিবুল ইসলাম। তার দাবি, হাসপাতালের ইতিহাসে এ ধরনের অস্ত্রোপচার এবারই প্রথম।

ইকরামুলের বাড়ি নড়াইল সদর উপজেলার তাড়াশি গ্রামে। তার বাবা বশির মোল্লা এক চোখে দেখতে পান না। মাত্র ৮ শতক জমির ওপর বসতভিটা ছাড়া পরিবারের আর কোনো উল্লেখযোগ্য সহায়-সম্বল নেই। সীমিত সামর্থ্যে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে ছেলের চিকিৎসার জন্য ২ লাখ টাকা জোগাড় করা ছিল দুঃসাধ্য।

এক মাস ধরে ওষুধ খেয়েও ব্যথা না কমায় ছেলেকে নিয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালে আসেন মা সালমা বেগম। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, ইকরামুলের হাঁটুর লিগামেন্টে আঘাত লেগেছে। অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হওয়ায় বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। অস্ত্রোপচারে প্রায় ২ লাখ টাকা লাগবে শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েন সালমা। এত টাকা জোগাড় করতে না পারলে ছেলের চিকিৎসা কীভাবে হবে, সেই চিন্তায় দিন কাটছিল তার।

এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের পাশে দাঁড়ান চিকিৎসক রাজিবুল ইসলাম। ইকরামুলের পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা জানতে পেরে তিনি নিজেই অস্ত্রোপচারের দায়িত্ব নেন। গত ৭ অক্টোবর হাসপাতালেই বিনা খরচে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। তবে অস্ত্রোপচারের পর প্রয়োজনীয় ওষুধের খরচ পরিবারকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বহন করতে হয়েছে।

অস্ত্রোপচারের পর এখন অনেকটাই সুস্থ ইকরামুল। পায়ের ব্যথা নেই বললেই চলে। বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছে সে। ধীরে ধীরে হাঁটাচলাও করতে পারছে। চিকিৎসক রাজিবুল ইসলাম নিয়মিত তার খোঁজখবর রাখছেন।

ইকরামুল বলে, আমার পায়ে এখন আর ব্যথা নেই। মোটামুটিভাবে হাঁটতে পারছি।

চিকিৎসক এস কে রাজিবুল ইসলাম অর্থোপেডিক সার্জারির বিশেষজ্ঞ। তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। তার পেশাগত যোগ্যতার মধ্যে রয়েছে ডি-অর্থ, বিসিএস (স্বাস্থ্য) ও এফসিপিএস (অর্থোপেডিক সার্জারি, ওয়াই-পি২)। সম্প্রতি ভারতের দিল্লি থেকে হাঁটুর লিগামেন্টের আর্থ্রোস্কোপিক অস্ত্রোপচার বিষয়ে ফেলোশিপ অর্জন করেছেন তিনি।

রাজিবুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের ওয়ার্ডে নিয়মিত রোগী দেখতে গিয়ে ইকরামুলের পরিবারের অসহায়ত্বের কথা জানতে পারি। এরপর তাদের জানাই, ইকরামুলের অস্ত্রোপচার যশোর জেনারেল হাসপাতালেই করব। পরিবার রাজি হলে গত ৭ অক্টোবর তার হাঁটুর লিগামেন্টের আঘাতের চিকিৎসায় অ্যাডভান্সড আর্থ্রোস্কোপিক এসিএল অস্ত্রোপচার করা হয়।

তিনি আরও বলেন, যশোর জেনারেল হাসপাতালে এ ধরনের হাঁটুর লিগামেন্ট অস্ত্রোপচার এবারই প্রথম। সরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন হওয়ায় ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসার খরচ থেকে রক্ষা পেয়েছে ইকরামুলের পরিবার। এখন থেকে এ ধরনের ব্যয়বহুল অস্ত্রোপচার সরকারি হাসপাতালেই করা সম্ভব হবে।

যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হুসাইন শাফায়াত বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা রোগীদের সর্বোত্তম সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবলেরও সংকট রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এ ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়া সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াবে।

চিকিৎসক রাজিবুল ইসলামের উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, আমার জানামতে, যশোর জেনারেল হাসপাতালে এ ধরনের লিগামেন্ট অস্ত্রোপচার এবারই প্রথম। আমরা চাই, উন্নত ও ব্যয়বহুল চিকিৎসাসেবা সরকারি হাসপাতালেই নিয়মিত দেওয়া সম্ভব হোক। সে লক্ষ্যেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষকে এ ধরনের চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের ওপর নির্ভর করতে না হয়।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

অর্থাভাবে আটকে যাচ্ছিল চিকিৎসা, সরকারি হাসপাতালে বিনা খরচে অস্ত্রোপচার

আপডেট সময় ০৭:২৫:০০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

ফুটবল খেলতে গিয়ে হাঁটুর লিগামেন্টে আঘাত পেয়েছিল ১৬ বছরের কিশোর ইকরামুল মোল্লা। এক মাস ওষুধ খেয়েও ব্যথা না কমায় চিকিৎসার জন্য আসে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, সুস্থ হতে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। বেসরকারি ক্লিনিকে এ অস্ত্রোপচারের খরচ ধরা হয় প্রায় ২ লাখ টাকা। অসচ্ছল পরিবারের পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করা ছিল প্রায় অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের এক চিকিৎসকের উদ্যোগে সরকারি হাসপাতালেই বিনা খরচে অস্ত্রোপচার হয়েছে ইকরামুলের। এখন ধীরে ধীরে হাঁটাচলা করতে পারছে সে।

গত ৭ অক্টোবর যশোর জেনারেল হাসপাতালে ইকরামুলের হাঁটুর লিগামেন্টে অ্যাডভান্সড আর্থ্রোস্কোপিক এসিএল অস্ত্রোপচার করেন হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জন ডা. এস কে রাজিবুল ইসলাম। তার দাবি, হাসপাতালের ইতিহাসে এ ধরনের অস্ত্রোপচার এবারই প্রথম।

ইকরামুলের বাড়ি নড়াইল সদর উপজেলার তাড়াশি গ্রামে। তার বাবা বশির মোল্লা এক চোখে দেখতে পান না। মাত্র ৮ শতক জমির ওপর বসতভিটা ছাড়া পরিবারের আর কোনো উল্লেখযোগ্য সহায়-সম্বল নেই। সীমিত সামর্থ্যে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে ছেলের চিকিৎসার জন্য ২ লাখ টাকা জোগাড় করা ছিল দুঃসাধ্য।

এক মাস ধরে ওষুধ খেয়েও ব্যথা না কমায় ছেলেকে নিয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালে আসেন মা সালমা বেগম। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, ইকরামুলের হাঁটুর লিগামেন্টে আঘাত লেগেছে। অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হওয়ায় বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। অস্ত্রোপচারে প্রায় ২ লাখ টাকা লাগবে শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েন সালমা। এত টাকা জোগাড় করতে না পারলে ছেলের চিকিৎসা কীভাবে হবে, সেই চিন্তায় দিন কাটছিল তার।

এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের পাশে দাঁড়ান চিকিৎসক রাজিবুল ইসলাম। ইকরামুলের পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা জানতে পেরে তিনি নিজেই অস্ত্রোপচারের দায়িত্ব নেন। গত ৭ অক্টোবর হাসপাতালেই বিনা খরচে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। তবে অস্ত্রোপচারের পর প্রয়োজনীয় ওষুধের খরচ পরিবারকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বহন করতে হয়েছে।

অস্ত্রোপচারের পর এখন অনেকটাই সুস্থ ইকরামুল। পায়ের ব্যথা নেই বললেই চলে। বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছে সে। ধীরে ধীরে হাঁটাচলাও করতে পারছে। চিকিৎসক রাজিবুল ইসলাম নিয়মিত তার খোঁজখবর রাখছেন।

ইকরামুল বলে, আমার পায়ে এখন আর ব্যথা নেই। মোটামুটিভাবে হাঁটতে পারছি।

চিকিৎসক এস কে রাজিবুল ইসলাম অর্থোপেডিক সার্জারির বিশেষজ্ঞ। তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। তার পেশাগত যোগ্যতার মধ্যে রয়েছে ডি-অর্থ, বিসিএস (স্বাস্থ্য) ও এফসিপিএস (অর্থোপেডিক সার্জারি, ওয়াই-পি২)। সম্প্রতি ভারতের দিল্লি থেকে হাঁটুর লিগামেন্টের আর্থ্রোস্কোপিক অস্ত্রোপচার বিষয়ে ফেলোশিপ অর্জন করেছেন তিনি।

রাজিবুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের ওয়ার্ডে নিয়মিত রোগী দেখতে গিয়ে ইকরামুলের পরিবারের অসহায়ত্বের কথা জানতে পারি। এরপর তাদের জানাই, ইকরামুলের অস্ত্রোপচার যশোর জেনারেল হাসপাতালেই করব। পরিবার রাজি হলে গত ৭ অক্টোবর তার হাঁটুর লিগামেন্টের আঘাতের চিকিৎসায় অ্যাডভান্সড আর্থ্রোস্কোপিক এসিএল অস্ত্রোপচার করা হয়।

তিনি আরও বলেন, যশোর জেনারেল হাসপাতালে এ ধরনের হাঁটুর লিগামেন্ট অস্ত্রোপচার এবারই প্রথম। সরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন হওয়ায় ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসার খরচ থেকে রক্ষা পেয়েছে ইকরামুলের পরিবার। এখন থেকে এ ধরনের ব্যয়বহুল অস্ত্রোপচার সরকারি হাসপাতালেই করা সম্ভব হবে।

যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হুসাইন শাফায়াত বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা রোগীদের সর্বোত্তম সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবলেরও সংকট রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এ ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়া সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াবে।

চিকিৎসক রাজিবুল ইসলামের উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, আমার জানামতে, যশোর জেনারেল হাসপাতালে এ ধরনের লিগামেন্ট অস্ত্রোপচার এবারই প্রথম। আমরা চাই, উন্নত ও ব্যয়বহুল চিকিৎসাসেবা সরকারি হাসপাতালেই নিয়মিত দেওয়া সম্ভব হোক। সে লক্ষ্যেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষকে এ ধরনের চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের ওপর নির্ভর করতে না হয়।