ঢাকা ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চার মহাদেশ পাড়ি দিয়ে ২৮ বছর পর বাড়ি ফিরলেন তিনি

কাগজের খবর ডেস্ক:

ব্রিটিশ অভিযাত্রী কার্ল বুশবি

দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যুক্তরাজ্যের নিজ শহর হাল পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ২৮ বছর পর বাড়ি ফিরেছেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী কার্ল বুশবি। দীর্ঘ এই যাত্রা শেষে মায়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে তার দীর্ঘদিনের অভিযান। সাবেক এই প্যারাট্রুপারের বাড়ি ফেরার মুহূর্তটি ছিল আবেগঘন।

১৯৯৮ সালের নভেম্বরে ২৯ বছর বয়সে চিলির পুন্টা অ্যারেনাস থেকে যাত্রা শুরু করেন বুশবি। তার লক্ষ্য ছিল কোনো ধরনের যানবাহন ব্যবহার না করে এবং মাঝপথে যুক্তরাজ্যে ফিরে না এসে একটানা স্থলপথ ও জলপথ পাড়ি দিয়ে নিজ দেশে পৌঁছানো।

যাত্রা শুরুর সময় নিজেই নিজের জন্য দুটি কঠোর নিয়ম নির্ধারণ করেছিলেন। প্রথমত, অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে ফিরবেন না। দ্বিতীয়ত, যাত্রার অগ্রগতির জন্য কোনো পরিবহণ ব্যবহার করবেন না।

চারটি মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত ছিল তার এই অভিযান। যাত্রাপথে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে বিপজ্জনক দারিয়েন গ্যাপের ঘন জঙ্গল, হিমশীতল বেরিং প্রণালি এবং সম্প্রতি ইংলিশ চ্যানেলও সাঁতরে অতিক্রম করেছেন তিনি।

দীর্ঘ অভিযানের শেষ পর্যায়ে হালের নগরকেন্দ্রে তাকে স্বাগত জানাতে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক মানুষ। পরে সেখান থেকে মায়ের বাড়ির উদ্দেশে শেষ কয়েক মাইল পথ পাড়ি দেন তিনি। বাড়ির দরজায় পৌঁছে বুশবি বলেন, বাড়িতে ফিরতে পেরে ভালো লাগছে। সবকিছু অবাস্তব মনে হচ্ছে।

মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলনের পর এক সংবাদ সম্মেলনে বুশবি জানান, এবার তিনি তার দীর্ঘদিনের পথচলার ইতি টানছেন।

হালের সাটন পার্ক এলাকায় নিজের বাড়িতে ছেলের অপেক্ষায় ছিলেন তার মা অ্যাঞ্জেলা বুশবি। বহু বছর আগে তাদের মধ্যে চুক্তি হয়েছিল, ছেলে ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি বাড়িতেই অপেক্ষা করবেন।

প্রায় এক দশক পর ছেলেকে সামনে পেয়ে আবেগাপ্লুত মা প্রশ্ন করেন, তুমি এত দিন কোথায় ছিলে? পরে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, তাকে বাড়িতে ফিরে পেয়ে ভালো লাগছে। আমি স্বস্তি অনুভব করছি।

বুশবি জানান, বাড়ি ফেরার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছেন না তিনি। তার ভাষায়, মাথার ভেতর সবকিছু যেন এলোমেলো হয়ে আছে। সামনে কী করবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার বলার মতো একটি গল্প আছে।

জার্মানির খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা ওয়ার্নার হার্জগের সঙ্গে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কাজ করছেন তিনি। পাশাপাশি নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে দ্বিতীয় বই লেখার কাজও চলছে।

এর আগে রোববার হাম্বার ব্রিজ অতিক্রম করে পূর্ব ইয়র্কশায়ারে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান ৩৬ বছর বয়সি ছেলে অ্যাডাম, ১২ বছর বয়সি নাতনি, যার সঙ্গে এর আগে কখনো দেখা হয়নি, বাবা এবং ভাইয়েরা। ওই পুনর্মিলনকে অসাধারণ বলে বর্ণনা করেন বুশবি।

হালের নগরকেন্দ্রে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান নগরপ্রধান মারিয়া কাউয়ার্ড। সেখানে উপস্থিত বিপুলসংখ্যক মানুষের উদ্দেশে বুশবি বলেন, আমার মনে হয়, কাউকে এমন স্বাগত আগে কখনো জানানো হয়নি। এটি অবিশ্বাস্য। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

তবে ২৮ বছরের এই অভিযানের পুরোটা সময় হাঁটতে হয়নি তাকে। বুশবির হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ১৫ বছর তিনি হেঁটেছেন। ভিসা জটিলতা, ২০০৭ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং করোনাভাইরাস মহামারির কারণে দীর্ঘ সময় বিলম্ব হয়েছে। অভিযানের বিরতিতে কম খরচে থাকার সুবিধার জন্য প্রায়ই মেক্সিকোতে অবস্থান করতেন তিনি।

যাত্রা শুরুর সময় তিনি ছিলেন প্রায় নিঃস্ব একজন ব্যাকপ্যাকার। অনেক সময় মানুষের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে তাকে। এমনকি কখনো কখনো রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া খাবার খেয়েও দিন কাটাতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তার অভিযানে পৃষ্ঠপোষকতা করে। পাশাপাশি বই প্রকাশের চুক্তি এবং প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সুযোগও পান তিনি।

বুশবি জানান, দেশে ফেরার পর স্বাভাবিক জীবনে মানিয়ে নিতে আগামী কয়েক দিন ও সপ্তাহ তার জন্য কঠিন হতে পারে। কারণ, জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় তিনি নিজেকে একজন অভিযাত্রী হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এখন সেই পরিচয় থেকে বেরিয়ে নতুন জীবন শুরু করাই হবে তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

একসময় ব্যক্তিগত জীবনের নানা পরিবর্তনের পরই এই অভিযানে বেরিয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল তার। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর স্ত্রী তাদের ছেলেকে নিয়ে উত্তর আয়ারল্যান্ডে ফিরে যান। সেই সময় থেকেই বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে যান বুশবি।

সূত্র: বিবিসি

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

চার মহাদেশ পাড়ি দিয়ে ২৮ বছর পর বাড়ি ফিরলেন তিনি

আপডেট সময় ০৭:০১:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যুক্তরাজ্যের নিজ শহর হাল পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ২৮ বছর পর বাড়ি ফিরেছেন ব্রিটিশ অভিযাত্রী কার্ল বুশবি। দীর্ঘ এই যাত্রা শেষে মায়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে তার দীর্ঘদিনের অভিযান। সাবেক এই প্যারাট্রুপারের বাড়ি ফেরার মুহূর্তটি ছিল আবেগঘন।

১৯৯৮ সালের নভেম্বরে ২৯ বছর বয়সে চিলির পুন্টা অ্যারেনাস থেকে যাত্রা শুরু করেন বুশবি। তার লক্ষ্য ছিল কোনো ধরনের যানবাহন ব্যবহার না করে এবং মাঝপথে যুক্তরাজ্যে ফিরে না এসে একটানা স্থলপথ ও জলপথ পাড়ি দিয়ে নিজ দেশে পৌঁছানো।

যাত্রা শুরুর সময় নিজেই নিজের জন্য দুটি কঠোর নিয়ম নির্ধারণ করেছিলেন। প্রথমত, অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে ফিরবেন না। দ্বিতীয়ত, যাত্রার অগ্রগতির জন্য কোনো পরিবহণ ব্যবহার করবেন না।

চারটি মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত ছিল তার এই অভিযান। যাত্রাপথে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে বিপজ্জনক দারিয়েন গ্যাপের ঘন জঙ্গল, হিমশীতল বেরিং প্রণালি এবং সম্প্রতি ইংলিশ চ্যানেলও সাঁতরে অতিক্রম করেছেন তিনি।

দীর্ঘ অভিযানের শেষ পর্যায়ে হালের নগরকেন্দ্রে তাকে স্বাগত জানাতে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক মানুষ। পরে সেখান থেকে মায়ের বাড়ির উদ্দেশে শেষ কয়েক মাইল পথ পাড়ি দেন তিনি। বাড়ির দরজায় পৌঁছে বুশবি বলেন, বাড়িতে ফিরতে পেরে ভালো লাগছে। সবকিছু অবাস্তব মনে হচ্ছে।

মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলনের পর এক সংবাদ সম্মেলনে বুশবি জানান, এবার তিনি তার দীর্ঘদিনের পথচলার ইতি টানছেন।

হালের সাটন পার্ক এলাকায় নিজের বাড়িতে ছেলের অপেক্ষায় ছিলেন তার মা অ্যাঞ্জেলা বুশবি। বহু বছর আগে তাদের মধ্যে চুক্তি হয়েছিল, ছেলে ফিরে না আসা পর্যন্ত তিনি বাড়িতেই অপেক্ষা করবেন।

প্রায় এক দশক পর ছেলেকে সামনে পেয়ে আবেগাপ্লুত মা প্রশ্ন করেন, তুমি এত দিন কোথায় ছিলে? পরে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, তাকে বাড়িতে ফিরে পেয়ে ভালো লাগছে। আমি স্বস্তি অনুভব করছি।

বুশবি জানান, বাড়ি ফেরার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছেন না তিনি। তার ভাষায়, মাথার ভেতর সবকিছু যেন এলোমেলো হয়ে আছে। সামনে কী করবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার বলার মতো একটি গল্প আছে।

জার্মানির খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা ওয়ার্নার হার্জগের সঙ্গে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কাজ করছেন তিনি। পাশাপাশি নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে দ্বিতীয় বই লেখার কাজও চলছে।

এর আগে রোববার হাম্বার ব্রিজ অতিক্রম করে পূর্ব ইয়র্কশায়ারে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান ৩৬ বছর বয়সি ছেলে অ্যাডাম, ১২ বছর বয়সি নাতনি, যার সঙ্গে এর আগে কখনো দেখা হয়নি, বাবা এবং ভাইয়েরা। ওই পুনর্মিলনকে অসাধারণ বলে বর্ণনা করেন বুশবি।

হালের নগরকেন্দ্রে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান নগরপ্রধান মারিয়া কাউয়ার্ড। সেখানে উপস্থিত বিপুলসংখ্যক মানুষের উদ্দেশে বুশবি বলেন, আমার মনে হয়, কাউকে এমন স্বাগত আগে কখনো জানানো হয়নি। এটি অবিশ্বাস্য। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

তবে ২৮ বছরের এই অভিযানের পুরোটা সময় হাঁটতে হয়নি তাকে। বুশবির হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ১৫ বছর তিনি হেঁটেছেন। ভিসা জটিলতা, ২০০৭ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং করোনাভাইরাস মহামারির কারণে দীর্ঘ সময় বিলম্ব হয়েছে। অভিযানের বিরতিতে কম খরচে থাকার সুবিধার জন্য প্রায়ই মেক্সিকোতে অবস্থান করতেন তিনি।

যাত্রা শুরুর সময় তিনি ছিলেন প্রায় নিঃস্ব একজন ব্যাকপ্যাকার। অনেক সময় মানুষের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে তাকে। এমনকি কখনো কখনো রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া খাবার খেয়েও দিন কাটাতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তার অভিযানে পৃষ্ঠপোষকতা করে। পাশাপাশি বই প্রকাশের চুক্তি এবং প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সুযোগও পান তিনি।

বুশবি জানান, দেশে ফেরার পর স্বাভাবিক জীবনে মানিয়ে নিতে আগামী কয়েক দিন ও সপ্তাহ তার জন্য কঠিন হতে পারে। কারণ, জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় তিনি নিজেকে একজন অভিযাত্রী হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এখন সেই পরিচয় থেকে বেরিয়ে নতুন জীবন শুরু করাই হবে তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

একসময় ব্যক্তিগত জীবনের নানা পরিবর্তনের পরই এই অভিযানে বেরিয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল তার। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর স্ত্রী তাদের ছেলেকে নিয়ে উত্তর আয়ারল্যান্ডে ফিরে যান। সেই সময় থেকেই বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে যান বুশবি।

সূত্র: বিবিসি