সরকার বিরোধী দলের কথা না শুনলে রাজপথেই ফয়সালা: শফিকুর রহমান
সরকার বিরোধী দলের যৌক্তিক দাবি ও বক্তব্যকে গুরুত্ব না দিলে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে এবং রাজপথের কর্মসূচির মাধ্যমেই এর সমাধান হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারের আলফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামীর বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
মতবিনিময়ে দেশের চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোট, দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস সংকট, কর্মসংস্থান, পোশাকশিল্প এবং বিরোধী দলের চলমান লংমার্চ কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন জামায়াত আমির। পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত নানা সমস্যা ও গণমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও খোঁজ নেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ। সাংবাদিকরা ভালোভাবে কাজ করতে পারলে দেশের মানুষও সঠিক তথ্য জানতে পারবে। তাই সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সত্যকে সত্য এবং অসঙ্গতিকে অসঙ্গতি হিসেবে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সমালোচনা করে তিনি বলেন, জ্বালানির মূল্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং এর প্রভাব ধীরে ধীরে প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার ওপর পড়ে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যায়। জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব বিষয় গণমাধ্যমে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
লংমার্চ নিয়ে সরকারি দলের বক্তব্যের সমালোচনা
বিরোধী দলের লংমার্চ নিয়ে সরকারি দলের সমালোচনার প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, চাইলে আরও বড় বহর নিয়ে কর্মসূচি পালন করা সম্ভব ছিল। তবে লংমার্চের দাবিগুলো কোনো একটি দলের নিজস্ব দাবি নয়; এগুলো সাধারণ মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়।
ঢাকা-রংপুর লংমার্চের আগে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা নিয়েও কথা বলেন তিনি। তার দাবি, বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করতে একটি আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল। জামায়াত কেন নিজের কর্মসূচি নিজেরাই নষ্ট করতে চাইবে—এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কর্মসূচি বানচালের উদ্দেশ্যে কেউ যদি এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করে থাকে, তার দায় তাদেরই নিতে হবে।
এমপি-মন্ত্রীদের সুবিধা বাড়ানোর বিরোধিতা
সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেলে বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্যদের আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে জামায়াত তার বিরোধিতা করবে বলে জানান শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধিরা জনগণের সেবা করার জন্য নির্বাচিত হন; ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর জন্য নয়। এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে বিরোধী দল তা প্রতিহত করবে বলেও জানান তিনি।
একই সঙ্গে সরকারের ঘোষিত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি অভিযোগ করেন, এক বছরের মধ্যে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেক মানুষ কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন। এ বিষয়টি গণমাধ্যমে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদে নোটিশ আলোচনায় না আসার অভিযোগ
সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হলেও সেগুলো নিয়মিত আলোচনার সুযোগ পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
তার ভাষ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, সার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শিশু নির্যাতন ও হত্যা এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধী দল একাধিকবার নোটিশ দিয়েছে। কিন্তু সব নোটিশ আলোচনার জন্য গ্রহণ করা হচ্ছে না।
এসব বিষয়ে সংসদের ভেতরে যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ায় বিরোধী দলকে রাজপথে আন্দোলনে যেতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে প্রশ্ন
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ব্যাখ্যা করে শফিকুর রহমান বলেন, দেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়। ফলে দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ বেরিয়ে যাবে। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত যানবাহনে নয়, যাত্রী পরিবহন ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও পড়বে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জ্বালানির দাম তুলনা করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে যেসব দেশের তুলনা করা হচ্ছে, সেসব দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও বাস্তবতা এক নয়।
গণমাধ্যমে বক্তব্য বিকৃত না করার আহ্বান
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, সাক্ষাৎকারে দেওয়া বক্তব্য অনেক সময় সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ না করে খণ্ডিত অংশ ব্যবহার করা হয়। এতে বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ পরিবর্তিত হয়ে পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে এমন বিভ্রান্তি এড়ানোর নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে তিনি আরও খোলামেলাভাবে কথা বলবেন বলেও জানান।
সরকারি সুবিধা নেওয়া নিয়েও বক্তব্য
শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের পর এখন পর্যন্ত সরকারি অর্থে তিনি বিদেশ সফর করেননি। সংসদ সদস্য হিসেবে পাওয়া মাসিক ভাতাও ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ না করে অন্য খাতে ব্যয় করেন বলে দাবি করেন তিনি।
নিজের জন্য বরাদ্দ সরকারি বাসায় না থাকার কথাও জানান জামায়াত আমির। তবে সেখানে কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সংগঠন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে জানান তিনি।
মতবিনিময় সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
সভায় জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপিসহ দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বিভিন্ন নেতা উপস্থিত ছিলেন।


























