ঢাকা ০৭:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘বাক্সবন্দি জীবন নয়, অপ্রতিমকে পৃথিবী চিনতে শেখাতে চেয়েছিলাম’

নিজস্ব সংবাদ :

নিজস্ব প্রতিবেদক:
সন্তানকে কেবল চার দেয়ালের মধ্যে নিরাপদে বড় করে তোলার বদলে স্বাধীনভাবে পৃথিবীকে জানার সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। তাঁর স্বপ্ন ছিল, একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম বড় হয়ে আত্মনির্ভরশীল মানুষ হবে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শিখবে এবং দেশ-বিদেশ ঘুরে জীবন ও পৃথিবীকে নিজের চোখে চিনবে। কিন্তু সেই স্বপ্নের সন্তানকে হারিয়ে এখন শোকের ভারে ভেঙে পড়েছেন তিনি।

১৩ বছর বয়সী অপ্রতিমকে হারানোর পর বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিজ বাসায় সাংবাদিকদের কাছে সন্তানকে বড় করে তোলার নানা স্মৃতি তুলে ধরেন ড. নাহিদা। এ সময় তাঁর কথায় উঠে আসে একদিকে সন্তানের প্রতি গভীর মমতা, অন্যদিকে সন্তান প্রতিপালন নিয়ে আত্মজিজ্ঞাসা।

ড. নাহিদা বলেন, সন্তানকে কখনো এমনভাবে বড় করতে চাননি, যেখানে সে সবসময় একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকবে। তাঁর ভাষায়, ‘ফার্মের মুরগির মতো’ কিংবা একটি বাক্সের মধ্যে বন্দি জীবন তিনি অপ্রতিমের জন্য চাননি। বরং চেয়েছিলেন, ছেলে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে মিশবে, বাস্তব জীবন সম্পর্কে জানবে এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করবে।

অপ্রতিমকে ভবিষ্যতে শুধু চিকিৎসক বা প্রকৌশলী বানানোর মতো গতানুগতিক কোনো পরিকল্পনাও ছিল না তাঁর। ছেলের জন্য তাঁর স্বপ্ন ছিল অনেক বিস্তৃত। তিনি চেয়েছিলেন, অপ্রতিম পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরবে, নতুন মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হবে এবং নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে পৃথিবীকে বুঝতে শিখবে।

শুধু একাডেমিক পড়াশোনার মধ্যেও ছেলের বেড়ে ওঠাকে সীমাবদ্ধ রাখেননি ড. নাহিদা। অপ্রতিমকে ফটোগ্রাফি, সাইক্লিং ও সাঁতার শেখানো হয়েছিল। আত্মরক্ষার জন্য দেওয়া হয়েছিল কারাতের প্রশিক্ষণও। একসময় নাচও শিখেছিল সে। ছেলের সেই সময়ের স্মৃতি হিসেবে বাড়িতে এখনো রয়েছে তার ব্যবহৃত হারমোনিয়াম।

অপ্রতিমকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার লক্ষ্য সম্পর্কে ড. নাহিদা বলেন, তাঁর ইচ্ছা ছিল ছেলে জীবনের ছোট-বড় বিষয়গুলো নিজের মতো করে বুঝতে শিখুক। কোনটি সবজি, কোনটি পেশা—এমন সাধারণ বিষয় থেকেও শুরু করে জীবনের নানা সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করুক। তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল, অপ্রতিম একদিন সারা পৃথিবী ঘুরে নিজের অভিজ্ঞতায় বিশ্বকে চিনবে।

অপ্রতিমের সামাজিকতার কথাও স্মরণ করেন মা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারত। বয়স বা পদমর্যাদার পার্থক্য তাকে দূরে সরিয়ে রাখত না। ছোটবেলা থেকেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী তাকে স্নেহ করতেন, কোলে তুলে নিতেন। সেই সূত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পরিচিত অনেককেই সে আপনজনের মতো ‘ভাইয়া’ বলে ডাকত।

তবে সন্তানকে যে স্বাধীন পরিবেশে বড় করে তুলতে চেয়েছিলেন, সেই প্যারেন্টিং নিয়েও এখন গভীর আত্মসমালোচনায় ড. নাহিদা। তিনি বলেন, তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি ভুলও হয়ে থাকতে পারে। সন্তানকে স্বাধীনতা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ভুল হয়ে থাকলে তার জন্য ক্ষমাও চান তিনি।

একই সঙ্গে অন্য অভিভাবকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন এই শিক্ষক। তাঁর মতে, সন্তানকে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া জরুরি হলেও তার বন্ধু-বান্ধব কারা, কোথায় যাচ্ছে এবং কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

অপ্রতিমকে হারানোর বেদনার মধ্যেও ড. নাহিদার কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে একজন মায়ের সেই স্বপ্ন, যিনি সন্তানকে শুধু পরীক্ষার ফল কিংবা নির্দিষ্ট কোনো পেশার জন্য নয়, বরং বাস্তব পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন। সেই স্বপ্ন এখন স্মৃতি হয়ে তাঁর ঘরজুড়ে পড়ে আছে—ছেলের ব্যবহৃত জিনিসপত্র আর অসংখ্য স্মৃতির মধ্যে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

‘বাক্সবন্দি জীবন নয়, অপ্রতিমকে পৃথিবী চিনতে শেখাতে চেয়েছিলাম’

আপডেট সময় ০৩:২৫:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক:
সন্তানকে কেবল চার দেয়ালের মধ্যে নিরাপদে বড় করে তোলার বদলে স্বাধীনভাবে পৃথিবীকে জানার সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। তাঁর স্বপ্ন ছিল, একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম বড় হয়ে আত্মনির্ভরশীল মানুষ হবে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শিখবে এবং দেশ-বিদেশ ঘুরে জীবন ও পৃথিবীকে নিজের চোখে চিনবে। কিন্তু সেই স্বপ্নের সন্তানকে হারিয়ে এখন শোকের ভারে ভেঙে পড়েছেন তিনি।

১৩ বছর বয়সী অপ্রতিমকে হারানোর পর বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিজ বাসায় সাংবাদিকদের কাছে সন্তানকে বড় করে তোলার নানা স্মৃতি তুলে ধরেন ড. নাহিদা। এ সময় তাঁর কথায় উঠে আসে একদিকে সন্তানের প্রতি গভীর মমতা, অন্যদিকে সন্তান প্রতিপালন নিয়ে আত্মজিজ্ঞাসা।

ড. নাহিদা বলেন, সন্তানকে কখনো এমনভাবে বড় করতে চাননি, যেখানে সে সবসময় একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকবে। তাঁর ভাষায়, ‘ফার্মের মুরগির মতো’ কিংবা একটি বাক্সের মধ্যে বন্দি জীবন তিনি অপ্রতিমের জন্য চাননি। বরং চেয়েছিলেন, ছেলে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে মিশবে, বাস্তব জীবন সম্পর্কে জানবে এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করবে।

অপ্রতিমকে ভবিষ্যতে শুধু চিকিৎসক বা প্রকৌশলী বানানোর মতো গতানুগতিক কোনো পরিকল্পনাও ছিল না তাঁর। ছেলের জন্য তাঁর স্বপ্ন ছিল অনেক বিস্তৃত। তিনি চেয়েছিলেন, অপ্রতিম পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরবে, নতুন মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হবে এবং নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে পৃথিবীকে বুঝতে শিখবে।

শুধু একাডেমিক পড়াশোনার মধ্যেও ছেলের বেড়ে ওঠাকে সীমাবদ্ধ রাখেননি ড. নাহিদা। অপ্রতিমকে ফটোগ্রাফি, সাইক্লিং ও সাঁতার শেখানো হয়েছিল। আত্মরক্ষার জন্য দেওয়া হয়েছিল কারাতের প্রশিক্ষণও। একসময় নাচও শিখেছিল সে। ছেলের সেই সময়ের স্মৃতি হিসেবে বাড়িতে এখনো রয়েছে তার ব্যবহৃত হারমোনিয়াম।

অপ্রতিমকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার লক্ষ্য সম্পর্কে ড. নাহিদা বলেন, তাঁর ইচ্ছা ছিল ছেলে জীবনের ছোট-বড় বিষয়গুলো নিজের মতো করে বুঝতে শিখুক। কোনটি সবজি, কোনটি পেশা—এমন সাধারণ বিষয় থেকেও শুরু করে জীবনের নানা সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করুক। তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল, অপ্রতিম একদিন সারা পৃথিবী ঘুরে নিজের অভিজ্ঞতায় বিশ্বকে চিনবে।

অপ্রতিমের সামাজিকতার কথাও স্মরণ করেন মা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারত। বয়স বা পদমর্যাদার পার্থক্য তাকে দূরে সরিয়ে রাখত না। ছোটবেলা থেকেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী তাকে স্নেহ করতেন, কোলে তুলে নিতেন। সেই সূত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পরিচিত অনেককেই সে আপনজনের মতো ‘ভাইয়া’ বলে ডাকত।

তবে সন্তানকে যে স্বাধীন পরিবেশে বড় করে তুলতে চেয়েছিলেন, সেই প্যারেন্টিং নিয়েও এখন গভীর আত্মসমালোচনায় ড. নাহিদা। তিনি বলেন, তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি ভুলও হয়ে থাকতে পারে। সন্তানকে স্বাধীনতা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ভুল হয়ে থাকলে তার জন্য ক্ষমাও চান তিনি।

একই সঙ্গে অন্য অভিভাবকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন এই শিক্ষক। তাঁর মতে, সন্তানকে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া জরুরি হলেও তার বন্ধু-বান্ধব কারা, কোথায় যাচ্ছে এবং কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

অপ্রতিমকে হারানোর বেদনার মধ্যেও ড. নাহিদার কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে একজন মায়ের সেই স্বপ্ন, যিনি সন্তানকে শুধু পরীক্ষার ফল কিংবা নির্দিষ্ট কোনো পেশার জন্য নয়, বরং বাস্তব পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন। সেই স্বপ্ন এখন স্মৃতি হয়ে তাঁর ঘরজুড়ে পড়ে আছে—ছেলের ব্যবহৃত জিনিসপত্র আর অসংখ্য স্মৃতির মধ্যে।