ঢাকা ০৫:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বপ্নের ভেতরে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ জীবনের রহস্য

কাগজের খবর ডেস্ক:

দীর্ঘ জীবনের রহস্য

অনেকের ধারণা, রাতে টানা সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমাতে পারলেই স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া হয়ে যায়। তবে আধুনিক ঘুম গবেষণায় ঘুমের মোট সময়ের পাশাপাশি ঘুমের গুণগত মান ও বিভিন্ন ধাপের গুরুত্বও উঠে এসেছে। বিশেষ করে যে সময়ে মানুষ উজ্জ্বল বা বিচিত্র স্বপ্ন দেখে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সেই পর্যায়কে বলা হয় র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট বা আরইএম স্লিপ। গবেষণার ফল অনুযায়ী, পর্যাপ্ত আরইএম স্লিপ মস্তিষ্ক, হৃদ্‌যন্ত্র ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ইউকে বায়োব্যাংকের তথ্য ব্যবহার করে করা এক গবেষণায় আরইএম স্লিপ ও রোগের ঝুকির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ‘প্লস মেডিসিন’-এ প্রকাশিত চীনের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণাটি প্রায় নয় বছর ধরে চালানো হয়। এতে ৯৫ হাজার ৫৫৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত আরইএম স্লিপ মস্তিষ্ক, হৃদ্‌যন্ত্র ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুকির সম্পর্ক রয়েছে।

স্বপ্নের পেছনের বিজ্ঞান ও মস্তিষ্কের বিশ্রাম

সাধারণত ঘুমানোর প্রায় ৯০ মিনিট পর আরইএম বা স্বপ্নের ঘুম শুরু হয় এবং এরপর প্রায় প্রতি ৯০ মিনিট পরপর এই পর্যায় ফিরে আসে। এ সময় চোখ দ্রুত নড়াচড়া করে এবং মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ বেড়ে যায়। একই সময়ে শরীরের পেশিগুলো সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে। এই ধাপেই মানুষ তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত ও বিচিত্র স্বপ্ন দেখে।

স্বপ্ন দেখার এই পর্যায়ে মস্তিষ্ক দিনের বিভিন্ন স্মৃতি প্রক্রিয়াজাত করে, সমস্যা সমাধানের দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত কার্যক্রম চালায় এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি রাতে গড়ে ৪৭ দশমিক ছয় থেকে ৪৮ মিনিট বেশি আরইএম স্লিপ পাওয়া ব্যক্তিদের ৮৩টি ভিন্ন রোগের ঝুকি তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

ডিমেনশিয়া ও পারকিনসন্সের ঝুকিতে প্রভাব

গবেষণার ফল অনুযায়ী, যারা রাতে বেশি সময় আরইএম স্লিপে থাকেন, তাদের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুকি ৪৬ শতাংশ কম ছিল। পর্যাপ্ত আরইএম স্লিপ পাওয়া ব্যক্তিদের পারকিনসনিজমের ঝুকি ৮০ শতাংশ কম এবং সরাসরি পারকিনসন্স রোগের ঝুকি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কম ছিল।

হৃদ্‌রোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুকিও কমতে পারে

হৃদ্‌যন্ত্র ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও ঘুমের বিভিন্ন ধাপের ভূমিকা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত আরইএম স্লিপ হার্ট ফেইলিউরের ঝুকি ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কম হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন ও ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজের ঝুকির সঙ্গেও আরইএম স্লিপের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

স্বপ্নের ঘুমের পাশাপাশি গভীর ঘুম বা স্লো-ওয়েভ ডিপ স্লিপও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় প্রতি রাতে অতিরিক্ত ৪৭ দশমিক পাচ মিনিট গভীর ঘুম টাইপ-দুই ডায়াবেটিসের ঝুকি ১১ শতাংশ কম হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

ভাঙা ঘুম ও অনিয়মিত সূচির ক্ষতিকর দিক

রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া কিংবা প্রতিদিন ভিন্ন সময়ে ঘুমাতে যাওয়াও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় ঘুমের ব্যাঘাত ও অনিয়মিত ঘুমের সঙ্গে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

রাতে ঘন ঘন ঘুম ভাঙলে বিষণ্নতা ও মাদকাসক্তিসহ ছয়টি দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুকি বাড়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একইভাবে ঘুমের সময়সূচি অনিয়মিত হলে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুকি যথাক্রমে ২৩ শতাংশ ও ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

গবেষকদের মতে, সুস্থ থাকতে প্রতি রাতে ছয় থেকে আট ঘণ্টা স্বাভাবিক ও নির্বিঘ্ন ঘুম প্রয়োজন। পাচ ঘণ্টার কম ঘুমের সঙ্গে প্রায় ৩৭টি রোগের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

সুস্থ ঘুমের জন্য যা করা যেতে পারে

পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঘুম বিশেষজ্ঞ ড. চেলসি রোরশাইবের মতে, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট শরীরচর্চা করলে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা কমতে পারে, যা ঘুমের মান উন্নত করতে সহায়তা করে।

ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিন বন্ধ করে বই পড়া, হালকা গান শোনা কিংবা কুসুম গরম পানিতে গোসল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বেলা তিন টার পর ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা এবং ঘুমানোর দুই ঘণ্টা আগে ভারী খাবার না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

স্বপ্নের ভেতরে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ জীবনের রহস্য

আপডেট সময় ০৬:৪৬:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

অনেকের ধারণা, রাতে টানা সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমাতে পারলেই স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া হয়ে যায়। তবে আধুনিক ঘুম গবেষণায় ঘুমের মোট সময়ের পাশাপাশি ঘুমের গুণগত মান ও বিভিন্ন ধাপের গুরুত্বও উঠে এসেছে। বিশেষ করে যে সময়ে মানুষ উজ্জ্বল বা বিচিত্র স্বপ্ন দেখে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সেই পর্যায়কে বলা হয় র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট বা আরইএম স্লিপ। গবেষণার ফল অনুযায়ী, পর্যাপ্ত আরইএম স্লিপ মস্তিষ্ক, হৃদ্‌যন্ত্র ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ইউকে বায়োব্যাংকের তথ্য ব্যবহার করে করা এক গবেষণায় আরইএম স্লিপ ও রোগের ঝুকির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ‘প্লস মেডিসিন’-এ প্রকাশিত চীনের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণাটি প্রায় নয় বছর ধরে চালানো হয়। এতে ৯৫ হাজার ৫৫৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত আরইএম স্লিপ মস্তিষ্ক, হৃদ্‌যন্ত্র ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুকির সম্পর্ক রয়েছে।

স্বপ্নের পেছনের বিজ্ঞান ও মস্তিষ্কের বিশ্রাম

সাধারণত ঘুমানোর প্রায় ৯০ মিনিট পর আরইএম বা স্বপ্নের ঘুম শুরু হয় এবং এরপর প্রায় প্রতি ৯০ মিনিট পরপর এই পর্যায় ফিরে আসে। এ সময় চোখ দ্রুত নড়াচড়া করে এবং মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ বেড়ে যায়। একই সময়ে শরীরের পেশিগুলো সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে। এই ধাপেই মানুষ তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত ও বিচিত্র স্বপ্ন দেখে।

স্বপ্ন দেখার এই পর্যায়ে মস্তিষ্ক দিনের বিভিন্ন স্মৃতি প্রক্রিয়াজাত করে, সমস্যা সমাধানের দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত কার্যক্রম চালায় এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি রাতে গড়ে ৪৭ দশমিক ছয় থেকে ৪৮ মিনিট বেশি আরইএম স্লিপ পাওয়া ব্যক্তিদের ৮৩টি ভিন্ন রোগের ঝুকি তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

ডিমেনশিয়া ও পারকিনসন্সের ঝুকিতে প্রভাব

গবেষণার ফল অনুযায়ী, যারা রাতে বেশি সময় আরইএম স্লিপে থাকেন, তাদের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুকি ৪৬ শতাংশ কম ছিল। পর্যাপ্ত আরইএম স্লিপ পাওয়া ব্যক্তিদের পারকিনসনিজমের ঝুকি ৮০ শতাংশ কম এবং সরাসরি পারকিনসন্স রোগের ঝুকি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কম ছিল।

হৃদ্‌রোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুকিও কমতে পারে

হৃদ্‌যন্ত্র ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও ঘুমের বিভিন্ন ধাপের ভূমিকা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত আরইএম স্লিপ হার্ট ফেইলিউরের ঝুকি ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কম হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন ও ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজের ঝুকির সঙ্গেও আরইএম স্লিপের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

স্বপ্নের ঘুমের পাশাপাশি গভীর ঘুম বা স্লো-ওয়েভ ডিপ স্লিপও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় প্রতি রাতে অতিরিক্ত ৪৭ দশমিক পাচ মিনিট গভীর ঘুম টাইপ-দুই ডায়াবেটিসের ঝুকি ১১ শতাংশ কম হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

ভাঙা ঘুম ও অনিয়মিত সূচির ক্ষতিকর দিক

রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া কিংবা প্রতিদিন ভিন্ন সময়ে ঘুমাতে যাওয়াও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় ঘুমের ব্যাঘাত ও অনিয়মিত ঘুমের সঙ্গে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

রাতে ঘন ঘন ঘুম ভাঙলে বিষণ্নতা ও মাদকাসক্তিসহ ছয়টি দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুকি বাড়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একইভাবে ঘুমের সময়সূচি অনিয়মিত হলে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুকি যথাক্রমে ২৩ শতাংশ ও ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

গবেষকদের মতে, সুস্থ থাকতে প্রতি রাতে ছয় থেকে আট ঘণ্টা স্বাভাবিক ও নির্বিঘ্ন ঘুম প্রয়োজন। পাচ ঘণ্টার কম ঘুমের সঙ্গে প্রায় ৩৭টি রোগের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

সুস্থ ঘুমের জন্য যা করা যেতে পারে

পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঘুম বিশেষজ্ঞ ড. চেলসি রোরশাইবের মতে, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট শরীরচর্চা করলে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা কমতে পারে, যা ঘুমের মান উন্নত করতে সহায়তা করে।

ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিন বন্ধ করে বই পড়া, হালকা গান শোনা কিংবা কুসুম গরম পানিতে গোসল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বেলা তিন টার পর ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা এবং ঘুমানোর দুই ঘণ্টা আগে ভারী খাবার না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।