ঢাকা ০২:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুঁজিবাজারে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হিসাব নজরদারিতে, বিএফআইইউর নতুন নির্দেশনা

নিজস্ব সংবাদ :

দেশের পুঁজিবাজারে অবৈধ অর্থের প্রবেশ, বেনামি লেনদেন ও অর্থপাচার ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। নতুন নির্দেশনার আওতায় শেয়ারবাজারে লেনদেনকারী রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বার্থের হিসাবগুলোকে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে।

একই সঙ্গে সন্দেহজনক ও অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত করতে ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক, পোর্টফোলিও ম্যানেজারসহ পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার এ বিষয়ে ‘সার্কুলার নং-৩১’ জারি করেছে বিএফআইইউ। সার্কুলারটি পুঁজিবাজারের সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিধান অনুসরণ করে জারি করা নির্দেশনায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা পর্ষদ বা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনার অনুমোদনের পর কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ও শাখা পর্যায়ে কমপ্লায়েন্স কাঠামো

নতুন ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ে চিফ অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসারের (ক্যামলকো) নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে শাখাগুলোতে শাখা পরিপালন কর্মকর্তা বা বিএএমএলকো নিয়োগের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।

গ্রাহকের পরিচয় যাচাইয়ে গুরুত্ব

নতুন হিসাব খোলার ক্ষেত্রে গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত করতে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট কিংবা জন্মনিবন্ধন সনদের তথ্য নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে ইলেকট্রনিক কেওয়াইসি বা ই-কেওয়াইসি ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়েছে।

প্রকৃত মালিকের তথ্য রাখতে হবে

কোনো প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারের মালিক ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে—এমন ব্যক্তির পরিচয় সংরক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ কোনো হিসাব বা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে থাকা প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিককে শনাক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা

রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, দেশীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের লেনদেনে অধিকতর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ অফশোর কোম্পানি বা কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেনও বাড়তি যাচাইয়ের আওতায় থাকবে। জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ সরকারের নিষিদ্ধ ব্যক্তি বা সন্ত্রাসী সত্তার তালিকার সঙ্গে নিয়মিতভাবে গ্রাহকের তথ্য মিলিয়ে দেখার নির্দেশনাও রয়েছে।

সন্দেহজনক লেনদেন হলেই রিপোর্ট

কোনো গ্রাহকের লেনদেনে অস্বাভাবিকতা বা অসঙ্গতি দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট শাখা কর্মকর্তা বিষয়টি লিখিতভাবে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিটকে জানাবেন। পর্যালোচনার পর লেনদেনটি সন্দেহজনক বলে মনে হলে ‘গো-এএমএল’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গোপনীয়তা বজায় রেখে বিএফআইইউতে সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (এসটিআর) পাঠাতে হবে।

ছয় মাস পরপর স্ব-মূল্যায়ন

প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি ছয় মাসে একবার নিজেদের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে হবে। জানুয়ারি-জুন এবং জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য নির্ধারিত চেকলিস্ট অনুসারে তৈরি স্ব-মূল্যায়ন প্রতিবেদন পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে বিএফআইইউতে জমা দিতে হবে।

এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগকে দিয়ে ওই প্রতিবেদন স্বাধীনভাবে যাচাই করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে তথ্য

কর্মী নিয়োগের সময় প্রার্থীর প্রয়োজনীয় ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখার কথাও বলা হয়েছে। কোনো হিসাব বন্ধ হয়ে গেলেও গ্রাহকের পরিচয়সংক্রান্ত নথি ও লেনদেনের রেকর্ড কমপক্ষে পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে।

বিএফআইইউর নতুন নির্দেশনার ফলে পুঁজিবাজারের লেনদেনে গ্রাহকের পরিচয়, প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্তকরণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব আরও স্পষ্ট ও কঠোর হলো। এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে অবৈধ অর্থের ব্যবহার ও অর্থপাচারের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে নজরদারি কাঠামো আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

পুঁজিবাজারে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হিসাব নজরদারিতে, বিএফআইইউর নতুন নির্দেশনা

আপডেট সময় ০২:৩৮:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশের পুঁজিবাজারে অবৈধ অর্থের প্রবেশ, বেনামি লেনদেন ও অর্থপাচার ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। নতুন নির্দেশনার আওতায় শেয়ারবাজারে লেনদেনকারী রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বার্থের হিসাবগুলোকে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে।

একই সঙ্গে সন্দেহজনক ও অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত করতে ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক, পোর্টফোলিও ম্যানেজারসহ পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার এ বিষয়ে ‘সার্কুলার নং-৩১’ জারি করেছে বিএফআইইউ। সার্কুলারটি পুঁজিবাজারের সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিধান অনুসরণ করে জারি করা নির্দেশনায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা পর্ষদ বা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনার অনুমোদনের পর কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ও শাখা পর্যায়ে কমপ্লায়েন্স কাঠামো

নতুন ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ে চিফ অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসারের (ক্যামলকো) নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে শাখাগুলোতে শাখা পরিপালন কর্মকর্তা বা বিএএমএলকো নিয়োগের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।

গ্রাহকের পরিচয় যাচাইয়ে গুরুত্ব

নতুন হিসাব খোলার ক্ষেত্রে গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত করতে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট কিংবা জন্মনিবন্ধন সনদের তথ্য নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে ইলেকট্রনিক কেওয়াইসি বা ই-কেওয়াইসি ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়েছে।

প্রকৃত মালিকের তথ্য রাখতে হবে

কোনো প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারের মালিক ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে—এমন ব্যক্তির পরিচয় সংরক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ কোনো হিসাব বা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে থাকা প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিককে শনাক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা

রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, দেশীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের লেনদেনে অধিকতর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ অফশোর কোম্পানি বা কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেনও বাড়তি যাচাইয়ের আওতায় থাকবে। জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ সরকারের নিষিদ্ধ ব্যক্তি বা সন্ত্রাসী সত্তার তালিকার সঙ্গে নিয়মিতভাবে গ্রাহকের তথ্য মিলিয়ে দেখার নির্দেশনাও রয়েছে।

সন্দেহজনক লেনদেন হলেই রিপোর্ট

কোনো গ্রাহকের লেনদেনে অস্বাভাবিকতা বা অসঙ্গতি দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট শাখা কর্মকর্তা বিষয়টি লিখিতভাবে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিটকে জানাবেন। পর্যালোচনার পর লেনদেনটি সন্দেহজনক বলে মনে হলে ‘গো-এএমএল’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গোপনীয়তা বজায় রেখে বিএফআইইউতে সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (এসটিআর) পাঠাতে হবে।

ছয় মাস পরপর স্ব-মূল্যায়ন

প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি ছয় মাসে একবার নিজেদের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে হবে। জানুয়ারি-জুন এবং জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য নির্ধারিত চেকলিস্ট অনুসারে তৈরি স্ব-মূল্যায়ন প্রতিবেদন পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে বিএফআইইউতে জমা দিতে হবে।

এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগকে দিয়ে ওই প্রতিবেদন স্বাধীনভাবে যাচাই করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে তথ্য

কর্মী নিয়োগের সময় প্রার্থীর প্রয়োজনীয় ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখার কথাও বলা হয়েছে। কোনো হিসাব বন্ধ হয়ে গেলেও গ্রাহকের পরিচয়সংক্রান্ত নথি ও লেনদেনের রেকর্ড কমপক্ষে পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে।

বিএফআইইউর নতুন নির্দেশনার ফলে পুঁজিবাজারের লেনদেনে গ্রাহকের পরিচয়, প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্তকরণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব আরও স্পষ্ট ও কঠোর হলো। এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে অবৈধ অর্থের ব্যবহার ও অর্থপাচারের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে নজরদারি কাঠামো আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।