নারী-শিশু সুরক্ষায় সেবা আছে, সমন্বয় ও সহজ প্রবেশাধিকারে বড় ঘাটতি
দেশে নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা চালু থাকলেও এসব সেবার মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া জটিল হওয়া এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত তথ্যের ঘাটতির কারণে অনেকেই প্রয়োজনের সময় আইনগত ও সুরক্ষা সহায়তা নিতে পারছেন না। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।
বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অংশীজন সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার ও সেবা প্রদান জোরদারকরণ’ শীর্ষক এ সংলাপের আয়োজন করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান। তিনি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসের পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, এই সময়ে দেশে নারীর ধর্ষণের ৪০০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ৩৭টি এবং ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ১৫২টি। একই সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ৬০৬টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪১টি ধর্ষণ এবং ২১৩টি শিশু হত্যার ঘটনা রয়েছে। নারী ও কিশোরীদের যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে ১৯১টি।
মানব পাচার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা। তাহমিনা রহমান জানান, ২০২৫ সালে মানব পাচারসংক্রান্ত ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। আর ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত দেশে বিচারাধীন ও তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৮৪টি।
সংলাপে উপস্থাপিত মূল নিবন্ধে জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত আইনগত সহায়তা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ১৮ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯ জন উপকৃত হয়েছেন।
এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে সেবা পেয়েছেন ৩১ হাজার ২২২ জন। দেশের ৬৪টি জেলা আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে সেবা পেয়েছেন ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন।
তবে আইনগত সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদন প্রক্রিয়াকে অনেকের জন্য জটিল ও সময়সাপেক্ষ বলে উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন পর্যায়ে অনুমোদন, নিয়মিত সভা না হওয়া এবং আবেদন প্রত্যাখ্যানের পর আপিলের প্রক্রিয়ায় জটিলতার কারণে সেবা পেতে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের জন্য এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যয়ও বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
নারী ও কিশোরীদের সুরক্ষায় দেশে ৯৫টি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) ও সেল থাকলেও সব জায়গায় প্রয়োজনীয় সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে সংলাপে উঠে আসে। চিকিৎসা, ফরেনসিক পরীক্ষা, আইনগত সহায়তা, মনোসামাজিক সেবা ও পুনর্বাসন—সবগুলো কার্যক্রম একই কাঠামোর মধ্যে কার্যকরভাবে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।
এ ছাড়া কিছু কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা সেবা, নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক ল্যাব এবং আলাদা কাউন্সেলিংয়ের জায়গার পর্যাপ্ততা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজমিন সুলতানা বলেন, নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার যাতে লঙ্ঘিত না হয়, সেটিই প্রকৃত সুরক্ষার মূল লক্ষ্য। তবে কোনো কারণে অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সংলাপে জিএফএ কনসাল্টিং গ্রুপের নাগরিকতা, সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড প্রকল্পের ডেপুটি টিম লিডার ক্যাটরিনা কইনিগ, উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার লিজা বেগম, মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা আইভি আক্তার, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসির কোঅর্ডিনেটর ডা. তাইয়েবা সুলতানা এবং নারীপক্ষের প্রোগ্রাম ম্যানেজার কামরুন্নাহারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
বক্তারা নারী, শিশু, যুব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান সেবাগুলোকে আরও সহজ, দ্রুত ও সমন্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের মধ্যে আইনগত সহায়তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, সেবাগ্রহীতাদের প্রবেশাধিকার সহজ করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।


























