ঢাকা ০১:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতিসংঘে সংস্কারের তাগিদ, বৈশ্বিক আস্থা ফেরাতে ৩ কৌশল দিলেন খলিলুর রহমান

নিজস্ব সংবাদ :

জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে জরুরি সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত পরিবর্তন, বৈশ্বিক আস্থা পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে এসব কথা বলেন তিনি। এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’।

নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামোয় আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি তুলে ধরে খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক সদস্যগোষ্ঠী আফ্রিকা। একই সঙ্গে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও মহাদেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। অথচ নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার কোনো স্থায়ী সদস্যপদ নেই।

তিনি বলেন, জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে আফ্রিকার যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এটি কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; বরং ন্যায়সংগত প্রতিনিধিত্ব এবং জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

নিরাপত্তা পরিষদকে বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি। একই সঙ্গে এ বিষয়ে সাধারণ পরিষদের চলমান আন্তঃসরকারি আলোচনা প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি।

বৈশ্বিক পর্যায়ে আস্থা পুনর্গঠনের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলের কথা তুলে ধরেন খলিলুর রহমান। প্রথমত, নিজেদের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা নিয়ে স্পষ্ট ও বাস্তববাদী হতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। তৃতীয়ত, নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সুশীল সমাজ এবং বিজ্ঞানীদের আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।

বিশ্বে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও সামরিক ব্যয়ের প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনের অগ্রগতি যখন নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তখন ওইসিডি দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা এক বছরে ২৩ শতাংশ কমে ১৭৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে একই সময়ে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় বেড়ে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি গাজা, সুদান, ইউক্রেন, মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক আইন এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার নীতিমালা কোনো পরিস্থিতিতেই বাছাই করে বা পক্ষপাতমূলকভাবে প্রয়োগ করা উচিত নয়।

বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি হাইতিতে জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এসব উদ্যোগ সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি।

এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের পাশাপাশি এর অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেন খলিলুর রহমান। বিশেষ করে পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও সামরিক ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার হলে তা বড় ধরনের মানবিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

এআইনির্ভর অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকাতে দ্রুত আন্তর্জাতিক নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দেন তিনি। এ জন্য বিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে প্রমাণভিত্তিক বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বা ‘গার্ডরেল’ তৈরির আহ্বান জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তাঁর বক্তব্যে সামগ্রিকভাবে জাতিসংঘকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

জাতিসংঘে সংস্কারের তাগিদ, বৈশ্বিক আস্থা ফেরাতে ৩ কৌশল দিলেন খলিলুর রহমান

আপডেট সময় ০৩:০০:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে জরুরি সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত পরিবর্তন, বৈশ্বিক আস্থা পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে এসব কথা বলেন তিনি। এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’।

নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামোয় আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি তুলে ধরে খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক সদস্যগোষ্ঠী আফ্রিকা। একই সঙ্গে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও মহাদেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। অথচ নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার কোনো স্থায়ী সদস্যপদ নেই।

তিনি বলেন, জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে আফ্রিকার যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এটি কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; বরং ন্যায়সংগত প্রতিনিধিত্ব এবং জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

নিরাপত্তা পরিষদকে বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি। একই সঙ্গে এ বিষয়ে সাধারণ পরিষদের চলমান আন্তঃসরকারি আলোচনা প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি।

বৈশ্বিক পর্যায়ে আস্থা পুনর্গঠনের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলের কথা তুলে ধরেন খলিলুর রহমান। প্রথমত, নিজেদের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা নিয়ে স্পষ্ট ও বাস্তববাদী হতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। তৃতীয়ত, নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সুশীল সমাজ এবং বিজ্ঞানীদের আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।

বিশ্বে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও সামরিক ব্যয়ের প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনের অগ্রগতি যখন নানা কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তখন ওইসিডি দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা এক বছরে ২৩ শতাংশ কমে ১৭৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে একই সময়ে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় বেড়ে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি গাজা, সুদান, ইউক্রেন, মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক আইন এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার নীতিমালা কোনো পরিস্থিতিতেই বাছাই করে বা পক্ষপাতমূলকভাবে প্রয়োগ করা উচিত নয়।

বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি হাইতিতে জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এসব উদ্যোগ সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি।

এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের পাশাপাশি এর অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেন খলিলুর রহমান। বিশেষ করে পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও সামরিক ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার হলে তা বড় ধরনের মানবিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

এআইনির্ভর অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকাতে দ্রুত আন্তর্জাতিক নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দেন তিনি। এ জন্য বিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে প্রমাণভিত্তিক বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বা ‘গার্ডরেল’ তৈরির আহ্বান জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তাঁর বক্তব্যে সামগ্রিকভাবে জাতিসংঘকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।