চীন-ভারতের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন চ্যালেঞ্জ, বদলাবে বাংলাদেশের আমদানি চিত্র?
বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে বড় ভূমিকা চীন ও ভারতের। শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে পোশাক তৈরির উপকরণ, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের বড় অংশই আসে এ দুই দেশ থেকে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্য উদ্যোগের ফলে আমদানির উৎসে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে জ্বালানি, কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের আমদানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি আগের তুলনায় আরও দৃশ্যমান হতে পারে।
তবে সামগ্রিক আমদানিতে চীন ও ভারতকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে উঠে আসবে কি না, সেটি এখনই বলা কঠিন। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান শিল্প কাঠামো এবং সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে চীন-ভারতের যে গভীর সংযোগ রয়েছে, তা দ্রুত পরিবর্তন করা সহজ নয়।
আমদানিতে এখনো অনেক এগিয়ে চীন-ভারত
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এর আগের অর্থবছরে এই আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এনেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরে যা ছিল ২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়লেও চীন ও ভারতের তুলনায় ব্যবধান এখনো বেশ বড়।
নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে বাড়ছে আমদানির সুযোগ
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির পর দুই দেশের আমদানি-রফতানি সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি, খাদ্যশস্য, তুলা, সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য কেনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর ফলে আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি আরও বাড়তে পারে।
তবে বাণিজ্য চুক্তি থাকলেই কোনো দেশের পণ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজারে প্রাধান্য পাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। পণ্যের দাম, মান, সরবরাহের সময়, পরিবহন ব্যয় এবং ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয়তাও আমদানির সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পোশাক খাতে চীন-ভারতের বিকল্প হওয়া কঠিন
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত তৈরি পোশাক। এ শিল্পের উৎপাদনব্যবস্থা চীন ও ভারতের সরবরাহ নেটওয়ার্কের সঙ্গে বহু বছর ধরে যুক্ত।
তুলা, সুতা, কাপড়, রং, রাসায়নিক, কারখানার যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন আনুষঙ্গিক উপকরণের বড় অংশ আসে এই দুই দেশ থেকে। কাছাকাছি অবস্থান, দ্রুত পণ্য সরবরাহ এবং তুলনামূলক কম পরিবহন ব্যয়ও আমদানিকারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক মনে করেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক আমদানি কাঠামো বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চীন ও ভারতকে দ্রুত ছাড়িয়ে যাওয়া কঠিন। কারণ বাংলাদেশের শিল্পের প্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের জন্য চীন ও ভারতের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা অনেক বেশি বিস্তৃত।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত সুতা, কাপড়, রাসায়নিক ও আনুষঙ্গিক উপকরণের ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা করা কঠিন হতে পারে।
জ্বালানি ও কৃষিপণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সম্ভাবনা
তবে কিছু নির্দিষ্ট পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হয়ে উঠতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম জ্বালানি।
নতুন বাণিজ্য উদ্যোগের আওতায় আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের সম্মতি বা সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে জ্বালানি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
গম, সয়াবিন ও তুলার মতো কৃষিপণ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
গমের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই দুই দেশের মধ্যে সরবরাহ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েশনের চুক্তির আওতায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত বছরে সর্বোচ্চ ৭ লাখ টন মার্কিন গম কেনার সুযোগ রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার টন গম আমদানি করেছে। চলতি অর্থবছরের জন্যও ২ লাখ ২০ হাজার টন গমের চুক্তি হয়েছে।
তবে কৃষিপণ্যের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। যেমন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের আমদানি করা ভুট্টার মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। একই সময়ে ব্রাজিলের অংশ ছিল প্রায় ৬৮ শতাংশ এবং ভারতের প্রায় ২৪ শতাংশ।
এতে স্পষ্ট, আমদানির উৎস নির্ধারণে চুক্তির পাশাপাশি দাম ও সরবরাহ সক্ষমতাও বড় ভূমিকা রাখে।
উড়োজাহাজে বড় অঙ্কের আমদানি
বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি বড় সম্ভাবনার জায়গা উড়োজাহাজ।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সম্প্রতি ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার অর্ডার দিয়েছে। এর সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। এর আগে আরও ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়েছিল।
বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসও প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে ২১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা দিয়েছে।
ফলে শুধু উড়োজাহাজ নয়, ভবিষ্যতে এর খুচরা যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও সংশ্লিষ্ট সেবাতেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, সাধারণ শিল্পপণ্য ও কাঁচামালের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চীন-ভারতের জায়গা নেওয়া কঠিন। তবে এলএনজি, তুলা, কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং উচ্চপ্রযুক্তির পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পের দীর্ঘদিনের সরবরাহব্যবস্থা বদলে ফেলা সম্ভব নয়। আমদানির ক্ষেত্রে দাম, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহের সময় এবং পণ্যের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চপ্রযুক্তির পণ্যে বাড়তে পারে মার্কিন অংশ
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদও মনে করেন, উচ্চমূল্যের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাবনা বেশি।
চিকিৎসা সরঞ্জাম, উন্নত প্রযুক্তির পণ্য, এলএনজি, সেমিকন্ডাক্টর এবং উড়োজাহাজের মতো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাংলাদেশের বাজারে বাড়তি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ সাধারণ কাঁচামাল ও শিল্পপণ্যে যেখানে চীন-ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কঠিন, সেখানে প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
ভৌগোলিক দূরত্বও বড় বিষয়
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো দূরত্ব।
চীন ও ভারত থেকে তুলনামূলক কম সময়ে পণ্য বাংলাদেশে পৌঁছানো সম্ভব। শিল্পের জন্য নিয়মিত প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উপকরণের ক্ষেত্রে দ্রুত সরবরাহ ব্যবসার খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আনতে দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে হয়। এতে পরিবহন, মজুত ও অর্থায়নের খরচ বাড়তে পারে। ফলে একই ধরনের পণ্য যদি চীন বা ভারত থেকে কম খরচে পাওয়া যায়, তাহলে শুধু বাণিজ্যিক সুবিধার কারণে আমদানিকারকেরা মার্কিন পণ্য বেছে নেবেন—এমনটা নিশ্চিত নয়।
এক দেশের জায়গায় আরেক দেশ নয়, বদল আসতে পারে পণ্যভেদে
সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের আমদানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে এলএনজি, গম, তুলা, সয়াবিন, উড়োজাহাজ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও উচ্চপ্রযুক্তির পণ্যে মার্কিন পণ্যের অংশ বাড়তে পারে।
তবে শিল্পের সাধারণ কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও আনুষঙ্গিক পণ্যের ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের অবস্থান এখনো শক্তিশালী। বাংলাদেশের উৎপাদনব্যবস্থা এবং ব্যবসায়িক সরবরাহ চেইনের সঙ্গে দেশ দুটির দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।
তাই বাংলাদেশের আমদানি বাজারে খুব দ্রুত এক দেশের জায়গায় অন্য দেশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেয়ে পণ্যভেদে আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আসার সম্ভাবনাই বেশি।
ভবিষ্যতে চীন ও ভারত সাধারণ শিল্পপণ্য ও কাঁচামালের বড় সরবরাহকারী হিসেবে থাকলেও জ্বালানি, উড়োজাহাজ, প্রযুক্তি, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও কিছু কৃষিপণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ আরও বাড়তে পারে।
শেষ পর্যন্ত আমদানির বাজারে কোন দেশের অবস্থান কতটা শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করবে শুধু বাণিজ্য চুক্তির ওপর নয়; বরং দাম, মান, সরবরাহের নিশ্চয়তা, পরিবহন ব্যয় এবং বাংলাদেশের শিল্প ও ভোক্তা চাহিদার ওপরই এর বড় অংশ নির্ধারিত হবে।























