জ্বালানি তেলের ধাক্কায় বাড়ছে পরিবহন ভাড়া, নিত্যপণ্যের বাজারেও নতুন শঙ্কা
জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পরপরই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের পরিবহন খাতে। রাজধানীর বিভিন্ন রুটে বাস ও লেগুনার ভাড়া বাড়ানোর পাশাপাশি দূরপাল্লার পরিবহন, পণ্যবাহী ট্রাক-পিকআপ এবং রাইডশেয়ারিংয়েও অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রতিদিনের যাতায়াত ব্যয় নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এখনো জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব দৃশ্যমান না হলেও পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়লে সামনে পণ্যের দামও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।
সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম আপাতত আগের পর্যায়েই রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোন পণ্যের দাম কতটা বাড়বে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
রাজধানীতে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ
জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর রাজধানীর চিটাগং রোড, সাইনবোর্ড, যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ এলাকা থেকে চলাচলকারী বিভিন্ন বাস ও লেগুনায় রুটভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
দূরপাল্লার পরিবহনেও এর প্রভাব পড়েছে। যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সায়েদাবাদ থেকে খুলনা, বরিশাল, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের বিভিন্ন রুটে কিছু বাসে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। চট্টগ্রামগামী লোকাল বাসেও কোথাও কোথাও ১০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
হঠাৎ ভাড়া বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত করা মানুষ। তাদের আশঙ্কা, ভাড়া এভাবে বাড়তে থাকলে মাসিক পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
রাইডশেয়ারিং সেবাতেও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন ব্যবহারকারীরা। জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে চালকদের কেউ কেউ অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন। পণ্য পরিবহনকারী ট্রাক ও পিকআপ চালকরাও পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন।
জ্বালানি নিতে গিয়েও ভোগান্তি
জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে পাম্পে সরবরাহ সীমিত করার অভিযোগ ওঠে। এতে জ্বালানি নিতে আসা গ্রাহকদের সঙ্গে ফিলিং স্টেশনের কর্মীদের বিরোধের পাশাপাশি কোথাও কোথাও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।
ঢাকার বাইরেও জ্বালানি বিক্রিকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের সঙ্গে পাম্পকর্মীদের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে।
‘দাম সমন্বয় ছাড়া বিকল্প ছিল না’
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম এবং পরিবহন ব্যয় বাড়তে থাকায় সরকারকে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের পাশাপাশি জাহাজভাড়াও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে মূল্য সমন্বয় না করে সরকারের সামনে কার্যত অন্য কোনো পথ ছিল না। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হতো না বলেও জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি খাতে সরকারের লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয় না করায় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ডিজেলের পরিমাণ প্রায় ৪৫ লাখ টন। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের গড় দাম লিটারপ্রতি প্রায় ২০৫ টাকা হলেও দেশে মূল্য সমন্বয়ের আগে তা ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। নতুন দাম নির্ধারণের পরও প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা লোকসান থাকছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তার দাবি, মূল্য সমন্বয় না করা হলে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং সব ধরনের জ্বালানি তেল মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারত।
জ্বালানি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন তিনি। সরকারের পরিকল্পনায় অসচ্ছল পরিবারগুলোকে পারিবারিক কার্ডের আওতায় আনার বিষয়টি রয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
প্রতিবেশী দেশগুলোর দামের তুলনা
জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের ডিজেলের দামের তুলনাও তুলে ধরেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কলকাতায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা, নেপালে ১৬১ টাকা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা। থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ও ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা দামের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি বিক্রি হওয়ায় সীমান্তপথে তেল পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যাতে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথাও জানান তিনি।
বাসভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব বিআরটিএর
এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।
সোমবার বিআরটিএর বনানী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ভাড়া সমন্বয় কমিটির বৈঠকে দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং মহানগর এলাকায় ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রস্তাবে যাত্রীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় রেখে বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা অপরিবর্তিত রাখার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাসের কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সা হতে পারে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের সিটি বাসে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে তা বাড়িয়ে ২ টাকা ৭৩ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়েছে। আর ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) আওতাধীন মিনিবাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৩২ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫২ পয়সা করার প্রস্তাব এসেছে।
তবে বিআরটিএর এই প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত নয়। সরকারের অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি হলেই নতুন ভাড়া কার্যকর হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবারের মধ্যেই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন ব্যয় বাড়তে শুরু করায় এখন সাধারণ মানুষের বড় উদ্বেগ—এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কতটা প্রভাব ফেলে। আপাতত বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন না এলেও পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়লে আগামী দিনগুলোতে তার প্রভাব পণ্যের দামে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

























