ঢাকা ০২:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মূল টাকা তুলতেও শর্ত, মুনাফা ছাড়ার অঙ্গীকারে গ্রাহকদের ক্ষোভ

নিজস্ব সংবাদ :

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে নিজেদের জমানো অর্থ এককালীন উত্তোলন করতে গিয়ে নতুন জটিলতার মুখে পড়ছেন আমানতকারীরা। অভিযোগ উঠেছে, মূল টাকা ফেরত নিতে হলে গ্রাহকদের মুনাফা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার দাবি ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার লিখিত অঙ্গীকার দিতে হচ্ছে।

ব্যাংকের এমন শর্তকে একতরফা ও হয়রানিমূলক দাবি করে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগী আমানতকারীরা।

আর্থিক সংকট ও অনিয়মের কারণে সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক—একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নেওয়া এ উদ্যোগের পর চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়।

টাকা তুলতে ‘অঙ্গীকারনামা’

ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কোনো আমানতকারী তাঁর মূল অর্থ একবারে তুলে নিতে চাইলে তাকে দুই পৃষ্ঠার একটি বিশেষ অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হচ্ছে।

ওই নথিতে উল্লেখ করা হচ্ছে, মূলধন তুলে নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট হিসাবের পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি হয়েছে বলে গণ্য হবে। এরপর ওই গ্রাহক, তাঁর নমিনি, উত্তরাধিকারী কিংবা আইনগত প্রতিনিধি ভবিষ্যতে মুনাফা বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা দাবি করতে পারবেন না। এমনকি এ বিষয়ে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ, আবেদন কিংবা মামলা করার সুযোগও থাকবে না—এমন বক্তব্যে সম্মতি দিতে হচ্ছে গ্রাহককে।

অঙ্গীকারনামায় আমানতকারীর স্বাক্ষরের পাশাপাশি দুজন সাক্ষীর স্বাক্ষরও নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

২০ দিনে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ফেরতের আবেদন

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮২ জন আমানতকারী অর্থ ফেরতের জন্য আবেদন করেছেন। এসব আবেদনের বিপরীতে ফেরত চাওয়া হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ৯০ হাজার ৯৮ জন গ্রাহককে ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকে নতুন করে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আমানত এসেছে। এছাড়া ৩২ হাজার ৭৪টি নতুন হিসাব খোলার মাধ্যমে জমা হয়েছে আরও ৩৭৮ কোটি টাকা।

‘হেয়ারকাট’ বাতিল হলেও নতুন শর্তের অভিযোগ

এর আগে গত ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানত স্থিতির ওপর দুই বছরের মুনাফা বাদ দেওয়ার বা ‘হেয়ারকাট’ করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল।

তবে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলে গত ২৫ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আমানতের ওপর কোনো হেয়ারকাট কার্যকর হবে না এবং ১ সেপ্টেম্বর থেকে গ্রাহকেরা তাঁদের মূল টাকা তুলতে পারবেন।

কিন্তু আমানতকারীদের অভিযোগ, বাস্তবে মূল টাকা এককালীন নিতে গেলে মুনাফার দাবি পরিত্যাগ এবং ভবিষ্যতে আইনি প্রতিকার না চাওয়ার অঙ্গীকার নেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেকে আবেদন করেও অর্থ না তুলে ফিরে যাচ্ছেন।

তারল্য সংকটের ব্যাখ্যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের বড় একটি অংশ সময়মতো আদায় না হওয়ায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এখনো তারল্য সংকটে রয়েছে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব আমানতকারী জরুরি প্রয়োজনে এখনই অর্থ তুলে নিচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে মুনাফা ছাড়ার বিষয়টি থাকছে। তবে ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অন্য আমানতকারীরা মুনাফাসহ তাঁদের অর্থ ফেরত পাবেন।

শাখায় শাখায় ভোগান্তির অভিযোগ

অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়ায় শাখা পর্যায়েও নানা ধরনের ভোগান্তির অভিযোগ করছেন গ্রাহকেরা। জরুরি প্রয়োজন দেখিয়ে আবেদন করার পরও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ঘোষিত তিন দিনের মধ্যে অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনেক আমানতকারী ২০ থেকে ২৫ দিন ধরে শাখায় ঘুরেও প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন পাননি বলে দাবি করছেন। কোথাও আবার হেয়ারকাট বাতিলের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা শাখায় পৌঁছেনি—এমন কারণ দেখিয়ে গ্রাহকদের অপেক্ষায় রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগীরা।

আমানতের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ

এর মধ্যেই ব্যক্তিগত মেয়াদি ও বিভিন্ন স্কিমভিত্তিক আমানতের মুনাফার হার নতুন করে নির্ধারণের বিষয়ে গত সোমবার ব্যাংকের বিভাগীয় প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপকদের চিঠি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে নতুন মুনাফার হার এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

একই নির্দেশনায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই শেষে মৃত আমানতকারীদের বৈধ দাবিদারদের অর্থ পরিশোধ এবং ব্লক থাকা হিসাবগুলো দ্রুত আনব্লক করে লেনদেনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, আমানত ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হলেও একদিকে অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে শর্ত, অন্যদিকে শাখা পর্যায়ের দীর্ঘসূত্রতা—দুই দিক থেকেই ভোগান্তিতে পড়েছেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনেক আমানতকারী।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

মূল টাকা তুলতেও শর্ত, মুনাফা ছাড়ার অঙ্গীকারে গ্রাহকদের ক্ষোভ

আপডেট সময় ০২:৫০:১২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে নিজেদের জমানো অর্থ এককালীন উত্তোলন করতে গিয়ে নতুন জটিলতার মুখে পড়ছেন আমানতকারীরা। অভিযোগ উঠেছে, মূল টাকা ফেরত নিতে হলে গ্রাহকদের মুনাফা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার দাবি ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার লিখিত অঙ্গীকার দিতে হচ্ছে।

ব্যাংকের এমন শর্তকে একতরফা ও হয়রানিমূলক দাবি করে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগী আমানতকারীরা।

আর্থিক সংকট ও অনিয়মের কারণে সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক—একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নেওয়া এ উদ্যোগের পর চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়।

টাকা তুলতে ‘অঙ্গীকারনামা’

ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কোনো আমানতকারী তাঁর মূল অর্থ একবারে তুলে নিতে চাইলে তাকে দুই পৃষ্ঠার একটি বিশেষ অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হচ্ছে।

ওই নথিতে উল্লেখ করা হচ্ছে, মূলধন তুলে নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট হিসাবের পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি হয়েছে বলে গণ্য হবে। এরপর ওই গ্রাহক, তাঁর নমিনি, উত্তরাধিকারী কিংবা আইনগত প্রতিনিধি ভবিষ্যতে মুনাফা বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা দাবি করতে পারবেন না। এমনকি এ বিষয়ে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ, আবেদন কিংবা মামলা করার সুযোগও থাকবে না—এমন বক্তব্যে সম্মতি দিতে হচ্ছে গ্রাহককে।

অঙ্গীকারনামায় আমানতকারীর স্বাক্ষরের পাশাপাশি দুজন সাক্ষীর স্বাক্ষরও নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

২০ দিনে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ফেরতের আবেদন

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮২ জন আমানতকারী অর্থ ফেরতের জন্য আবেদন করেছেন। এসব আবেদনের বিপরীতে ফেরত চাওয়া হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ৯০ হাজার ৯৮ জন গ্রাহককে ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকে নতুন করে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আমানত এসেছে। এছাড়া ৩২ হাজার ৭৪টি নতুন হিসাব খোলার মাধ্যমে জমা হয়েছে আরও ৩৭৮ কোটি টাকা।

‘হেয়ারকাট’ বাতিল হলেও নতুন শর্তের অভিযোগ

এর আগে গত ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানত স্থিতির ওপর দুই বছরের মুনাফা বাদ দেওয়ার বা ‘হেয়ারকাট’ করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল।

তবে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলে গত ২৫ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আমানতের ওপর কোনো হেয়ারকাট কার্যকর হবে না এবং ১ সেপ্টেম্বর থেকে গ্রাহকেরা তাঁদের মূল টাকা তুলতে পারবেন।

কিন্তু আমানতকারীদের অভিযোগ, বাস্তবে মূল টাকা এককালীন নিতে গেলে মুনাফার দাবি পরিত্যাগ এবং ভবিষ্যতে আইনি প্রতিকার না চাওয়ার অঙ্গীকার নেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেকে আবেদন করেও অর্থ না তুলে ফিরে যাচ্ছেন।

তারল্য সংকটের ব্যাখ্যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের বড় একটি অংশ সময়মতো আদায় না হওয়ায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এখনো তারল্য সংকটে রয়েছে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব আমানতকারী জরুরি প্রয়োজনে এখনই অর্থ তুলে নিচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে মুনাফা ছাড়ার বিষয়টি থাকছে। তবে ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অন্য আমানতকারীরা মুনাফাসহ তাঁদের অর্থ ফেরত পাবেন।

শাখায় শাখায় ভোগান্তির অভিযোগ

অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়ায় শাখা পর্যায়েও নানা ধরনের ভোগান্তির অভিযোগ করছেন গ্রাহকেরা। জরুরি প্রয়োজন দেখিয়ে আবেদন করার পরও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ঘোষিত তিন দিনের মধ্যে অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনেক আমানতকারী ২০ থেকে ২৫ দিন ধরে শাখায় ঘুরেও প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন পাননি বলে দাবি করছেন। কোথাও আবার হেয়ারকাট বাতিলের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা শাখায় পৌঁছেনি—এমন কারণ দেখিয়ে গ্রাহকদের অপেক্ষায় রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগীরা।

আমানতের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ

এর মধ্যেই ব্যক্তিগত মেয়াদি ও বিভিন্ন স্কিমভিত্তিক আমানতের মুনাফার হার নতুন করে নির্ধারণের বিষয়ে গত সোমবার ব্যাংকের বিভাগীয় প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপকদের চিঠি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে নতুন মুনাফার হার এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

একই নির্দেশনায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই শেষে মৃত আমানতকারীদের বৈধ দাবিদারদের অর্থ পরিশোধ এবং ব্লক থাকা হিসাবগুলো দ্রুত আনব্লক করে লেনদেনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, আমানত ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হলেও একদিকে অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে শর্ত, অন্যদিকে শাখা পর্যায়ের দীর্ঘসূত্রতা—দুই দিক থেকেই ভোগান্তিতে পড়েছেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনেক আমানতকারী।