মাটির অল্প গভীরেই ১৪৬ মিলিয়ন টন পিট, তবু বাণিজ্যিক ব্যবহার নেই
দেশের মাটির নিচে বিপুল পরিমাণ পিটের মজুত থাকলেও এখন পর্যন্ত এর কোনো বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়নি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আবিষ্কৃত শুকনো পিটের মোট মজুত প্রায় ১৪৬ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন টন। এর বড় অংশ রয়েছে গোপালগঞ্জ-মাদারীপুরের বাঘিয়া ও চান্দা বিল এলাকায়।
ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে ১৯৫৩ সালে বাঘিয়া-চান্দা বিল এলাকায় বড় ধরনের পিটের সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তী জরিপগুলোতে প্রায় ৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় পিটের বিস্তৃতি শনাক্ত করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু এলাকায় ভূপৃষ্ঠের খুব কাছেই এই জৈব জ্বালানির স্তর রয়েছে। কোথাও কোথাও ওপরের পলিমাটির স্তর পেরোলেই পিটের সন্ধান মিলেছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—এটিকে সাধারণ কয়লা বলার চেয়ে ‘পিট’ বা কয়লার প্রাথমিক স্তর বলা বেশি সঠিক। পিট হলো জলাবদ্ধ পরিবেশে উদ্ভিদের আংশিক পচে তৈরি জৈব পদার্থ, যা ভূতাত্ত্বিকভাবে কয়লা তৈরির প্রাথমিক পর্যায়ের উপাদান।
জ্বালানি হিসেবে কতটা কার্যকর?
গবেষণায় গোপালগঞ্জ-মাদারীপুরের পিটে প্রায় ৫৯ শতাংশ কার্বন থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০ শতাংশ আর্দ্রতা কমানোর পর এর ক্যালোরিফিক ভ্যালু প্রায় ১,৩০৮.৮ কিলোক্যালরি/কেজি পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, এটি উচ্চমানের কয়লার বিকল্প নয়; বরং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গৃহস্থালি ও সীমিত শিল্প ব্যবহারে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
অন্যদিকে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পিটে কার্বনের পরিমাণ প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ এবং ক্যালোরিফিক ভ্যালু ৫,৫০০ থেকে ৭,০০০ BTU/পাউন্ডের মধ্যে। প্রতিবেদনে পিটকে ব্রিকেট, ওভয়েড বা কমপ্রেসড ট্যাবলেট আকারে ব্যবহার করে গৃহস্থালি, ইট ও চুন শিল্প এবং ছোট ক্ষমতার তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজে লাগানোর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তাহলে এতদিন ব্যবহার হয়নি কেন?
এর অন্যতম কারণ হলো—বাঘিয়া-চান্দা বিল একটি বিশাল জলাভূমি অঞ্চল। বর্ষাকালে এসব এলাকা পানিতে ডুবে থাকে এবং পুরো গোপালগঞ্জ-খুলনা পিট বেসিনই পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল একটি নিম্নভূমি। সরকারি পরিবেশগত নথিতেও অঞ্চলটিকে বাংলাদেশের বৃহৎ পিটভাণ্ডার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে শুধু মাটির নিচে জ্বালানি আছে বলেই তা তুলে ফেলা যাবে—বিষয়টি এত সরল নয়। পিট উত্তোলনে জলপ্রবাহ, কৃষি, মাছ, জলজ উদ্ভিদ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা আগে মূল্যায়ন করতে হবে।
গবেষণায় অবশ্য ব্যবহারের সম্ভাবনাও উঠে এসেছে
১৯৮০-এর দশকের বিভিন্ন গবেষণায় বাঘিয়া-চান্দা এলাকার পিট ব্যবহার করে ছোট আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ইটভাটায় জ্বালানি সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। ২০১০ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন দুটি গবেষণায় ১০ থেকে ২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রে পিট ব্যবহারের সম্ভাবনা উঠে এসেছিল।
অর্থাৎ, পিটের ব্যবহার নিয়ে সম্ভাবনার আলোচনা নতুন নয়। কিন্তু সম্ভাবনা আর বাস্তবসম্মত বাণিজ্যিক প্রকল্প—দুটি এক বিষয় নয়।
আমদানি করা কয়লার সঙ্গে কি সরাসরি তুলনা করা যায়?
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বর্তমানে আমদানি করা কয়লার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৯ লাখ ৭ হাজার টন কয়লা উৎপাদনের বিপরীতে আমদানি হয়েছে প্রায় ১২.৭ মিলিয়ন টন।
তবে দেশীয় পিটকে সরাসরি আমদানি করা উচ্চতাপীয় কয়লার বিকল্প হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। পিটের আর্দ্রতা, শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা, উত্তোলন ব্যয় এবং পরিবেশগত প্রভাব—সবকিছু বিবেচনা করে আলাদা অর্থনৈতিক ও কারিগরি সমীক্ষা প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন—ব্যবহার হবে, নাকি সংরক্ষণ?
বাঘিয়া-চান্দা বিলে থাকা বিপুল পিট বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে জ্বালানি সম্ভাবনা এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। একদিকে দেশে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজন রয়েছে, অন্যদিকে জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই বিতর্কটি শুধু ‘দেশি পিট তুলব কি তুলব না’—এমন সরল প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রয়োজন হতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা।
কতটুকু পিট বাস্তবে উত্তোলনযোগ্য, উত্তোলনে পরিবেশগত ক্ষতি কতটা হবে, প্রতি ইউনিট জ্বালানির প্রকৃত খরচ কত হবে এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর কী প্রভাব পড়বে—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
মাটির অল্প গভীরে থাকা এই বিপুল সম্পদ কি বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় সীমিত পরিসরে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে, নাকি জলাভূমির পরিবেশগত মূল্য বিবেচনায় এটিকে মাটির নিচেই রাখা উচিত—সিদ্ধান্তের আগে দরকার তথ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন।























