ঢাকা ০১:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুদিনেই কাঁচা মরিচে ঝাল, যশোরে কেজি ৩২০ টাকা ছুঁইছুঁই

নিজস্ব সংবাদ :

নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর:
মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে যশোরের বাজারে কাঁচা মরিচের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টি, স্থানীয় উৎপাদনে ঘাটতি এবং বাইরের জেলার সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।

রবিবার যশোর শহরের বড়বাজার, চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড বাজার ও রেলগেট বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দিন আগেও যে মরিচ ২৪০-২৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেটিই এখন ৩০০ টাকার ওপরে উঠেছে।

রেলগেট বাজারে কেনাকাটা করতে আসা নুরুজ্জামান বলেন, “দুই দিন আগেই ২৪০ টাকায় মরিচ কিনেছি। আজ ৩০০ টাকা দিতে হলো। এত দ্রুত দাম বাড়া সাধারণ মানুষের জন্য বড় চাপ।”

দেশি মরিচের ঘাটতি, বাজার নির্ভর বাইরের জেলার ওপর

সবজি বিক্রেতা আব্দুর রহমান জানান, অতিবৃষ্টিতে অনেক মরিচক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে স্থানীয় কৃষকদের মরিচ বাজারে আসছে না। বর্তমানে যশোরের চাহিদার বড় অংশ ফরিদপুরের মধুখালী এলাকা থেকে আনা মরিচ দিয়ে পূরণের চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, “সরবরাহ খুব কম। বর্ষা মৌসুমে নতুন উৎপাদন না আসা পর্যন্ত দাম কমার সম্ভাবনা কম।”

অন্যান্য সবজির দামও চড়া

কাঁচা মরিচের পাশাপাশি বেশিরভাগ সবজির দামও সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে গেছে। বাজারে বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১৪০-১৬০ টাকা কেজি দরে। উচ্ছে ১২০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা এবং কাঁকরোল, ওল, করলা, কচুরলতি ও শসা ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া পটল, চিচিঙ্গা, ঢেঁড়স, কচুরমুখি ও লাউয়ের দাম প্রায় ৬০ টাকা কেজি। টমেটো ও গাজর ১২০ টাকা, বিটকপি ৮০ টাকা, আলু ২৫-৩০ টাকা, কাঁচকলা ৪০ টাকা এবং পেঁপে ৩০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।

পানিতে তলিয়েছে ক্ষেত, কমেছে সরবরাহ

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিতে যশোরের বিভিন্ন উপজেলার সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক জমিতে গাছ পচে গেছে, ফলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। দক্ষিণাঞ্চলের বড় পাইকারি কেন্দ্র সাতমাইল বারিনগর হাট থেকেও আগের তুলনায় কম পরিমাণ সবজি ও মরিচ আসছে।

হাট সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে প্রতিদিন এক হাজার থেকে দেড় হাজার কেজি মরিচ উঠলেও এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ৩০০-৪০০ কেজিতে।

কৃষি বিভাগের ব্যাখ্যা

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বছর জেলায় প্রায় ৬০০ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে খরার পর অতিবৃষ্টি হওয়ায় মরিচক্ষেত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে এমনিতেই উৎপাদন কম থাকে, তার ওপর আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

কৃষি বিভাগ আশা করছে, আগামী এক মাসের মধ্যে আবহাওয়া অনুকূলে এলে উৎপাদন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।

রাজধানীতেও বাড়তি চাপ

ঢাকার বাজারেও কাঁচা মরিচের দাম এখনও অনেক বেশি। বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ৩২০ থেকে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিন আগে কিছু বাজারে দাম ৪০০ টাকাও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

দাম কমাতে আমদানির সিদ্ধান্ত

বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কাঁচা মরিচ আমদানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, আমদানির ওপর বিদ্যমান কর কমানো হচ্ছে এবং সোমবার থেকেই আমদানি কার্যক্রম শুরু করা যাবে।

রাজধানীর শান্তিনগর কাঁচাবাজার পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, “দ্রুত আমদানি শুরু হলে দুই থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং কাঁচা মরিচের দাম সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।”

এদিকে যশোরের ভোক্তাদের অভিযোগ, শুধু আবহাওয়াকে দায়ী করলে হবে না; বাজারে সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত মুনাফার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তারা নিয়মিত বাজার তদারকি ও কঠোর মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

দুদিনেই কাঁচা মরিচে ঝাল, যশোরে কেজি ৩২০ টাকা ছুঁইছুঁই

আপডেট সময় ০৩:২১:১২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর:
মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে যশোরের বাজারে কাঁচা মরিচের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক টানা বৃষ্টি, স্থানীয় উৎপাদনে ঘাটতি এবং বাইরের জেলার সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।

রবিবার যশোর শহরের বড়বাজার, চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড বাজার ও রেলগেট বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দিন আগেও যে মরিচ ২৪০-২৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেটিই এখন ৩০০ টাকার ওপরে উঠেছে।

রেলগেট বাজারে কেনাকাটা করতে আসা নুরুজ্জামান বলেন, “দুই দিন আগেই ২৪০ টাকায় মরিচ কিনেছি। আজ ৩০০ টাকা দিতে হলো। এত দ্রুত দাম বাড়া সাধারণ মানুষের জন্য বড় চাপ।”

দেশি মরিচের ঘাটতি, বাজার নির্ভর বাইরের জেলার ওপর

সবজি বিক্রেতা আব্দুর রহমান জানান, অতিবৃষ্টিতে অনেক মরিচক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে স্থানীয় কৃষকদের মরিচ বাজারে আসছে না। বর্তমানে যশোরের চাহিদার বড় অংশ ফরিদপুরের মধুখালী এলাকা থেকে আনা মরিচ দিয়ে পূরণের চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, “সরবরাহ খুব কম। বর্ষা মৌসুমে নতুন উৎপাদন না আসা পর্যন্ত দাম কমার সম্ভাবনা কম।”

অন্যান্য সবজির দামও চড়া

কাঁচা মরিচের পাশাপাশি বেশিরভাগ সবজির দামও সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে গেছে। বাজারে বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১৪০-১৬০ টাকা কেজি দরে। উচ্ছে ১২০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা এবং কাঁকরোল, ওল, করলা, কচুরলতি ও শসা ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া পটল, চিচিঙ্গা, ঢেঁড়স, কচুরমুখি ও লাউয়ের দাম প্রায় ৬০ টাকা কেজি। টমেটো ও গাজর ১২০ টাকা, বিটকপি ৮০ টাকা, আলু ২৫-৩০ টাকা, কাঁচকলা ৪০ টাকা এবং পেঁপে ৩০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।

পানিতে তলিয়েছে ক্ষেত, কমেছে সরবরাহ

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিতে যশোরের বিভিন্ন উপজেলার সবজিক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক জমিতে গাছ পচে গেছে, ফলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। দক্ষিণাঞ্চলের বড় পাইকারি কেন্দ্র সাতমাইল বারিনগর হাট থেকেও আগের তুলনায় কম পরিমাণ সবজি ও মরিচ আসছে।

হাট সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে প্রতিদিন এক হাজার থেকে দেড় হাজার কেজি মরিচ উঠলেও এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ৩০০-৪০০ কেজিতে।

কৃষি বিভাগের ব্যাখ্যা

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বছর জেলায় প্রায় ৬০০ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে খরার পর অতিবৃষ্টি হওয়ায় মরিচক্ষেত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে এমনিতেই উৎপাদন কম থাকে, তার ওপর আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

কৃষি বিভাগ আশা করছে, আগামী এক মাসের মধ্যে আবহাওয়া অনুকূলে এলে উৎপাদন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।

রাজধানীতেও বাড়তি চাপ

ঢাকার বাজারেও কাঁচা মরিচের দাম এখনও অনেক বেশি। বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ৩২০ থেকে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিন আগে কিছু বাজারে দাম ৪০০ টাকাও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

দাম কমাতে আমদানির সিদ্ধান্ত

বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কাঁচা মরিচ আমদানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, আমদানির ওপর বিদ্যমান কর কমানো হচ্ছে এবং সোমবার থেকেই আমদানি কার্যক্রম শুরু করা যাবে।

রাজধানীর শান্তিনগর কাঁচাবাজার পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, “দ্রুত আমদানি শুরু হলে দুই থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং কাঁচা মরিচের দাম সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।”

এদিকে যশোরের ভোক্তাদের অভিযোগ, শুধু আবহাওয়াকে দায়ী করলে হবে না; বাজারে সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত মুনাফার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তারা নিয়মিত বাজার তদারকি ও কঠোর মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন।