ঢাকা ০২:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছয় সন্তানের জন্য জীবন উৎসর্গ, শেষ বয়সে গাছতলায় আশ্রয় ৯৫ বছরের বাবার!

নিজস্ব সংবাদ :

সারাজীবনের পরিশ্রম, ঘাম আর ভালোবাসা দিয়ে ছয় সন্তানকে বড় করেছেন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী জমিজমাও ভাগ করে দিয়েছেন তাদের মধ্যে। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই সন্তানদের কাছেই যেন অবাঞ্ছিত হয়ে পড়েছেন ৯৫ বছর বয়সী হাজী শামসুল হক মোল্লা। ছয় সন্তানের কারও ঘরেই জোটেনি তার স্থায়ী আশ্রয়। শেষ পর্যন্ত বাড়ির পাশের একটি গাছের নিচেই কাটছে তার দিন।

হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তর হিরন গ্রামে। হাজী শামসুল হক মোল্লা ওই গ্রামের ওমেদ আলী মোল্লার ছেলে। তার সংসারে রয়েছে দুই ছেলে ও চার মেয়ে। অথচ জীবনের শেষ বয়সে এসে আপনজনদের কাছ থেকেই এমন অবহেলার শিকার হতে হচ্ছে তাকে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে নিজের জমি বিক্রি করে পবিত্র হজ পালন করেন শামসুল হক। এরপর অবশিষ্ট জমিজমাও সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেন। অভিযোগ রয়েছে, ছয় সন্তান মিলে তার সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার পর থেকেই বৃদ্ধ বাবার দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা দেখাতে শুরু করেন।

তার বড় ছেলে আজিজুল মোল্লা পেশায় ফেরিওয়ালা এবং ছোট ছেলে রেয়াজুল মোল্লা বাসের হেলপার। চার মেয়ের মধ্যে মায়া, সাবিনা ও সালমা বিবাহিত। ছোট মেয়ে কাজুলী শারীরিক প্রতিবন্ধী। তার পাঁচ সন্তান নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বৃদ্ধ বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে টানাপোড়েন।

সম্প্রতি কয়েকদিন বড় মেয়ে মায়া বেগমের বাড়িতে ছিলেন শামসুল হক। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে মায়া তাকে ভাইদের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে দুই ছেলে ও তাদের স্ত্রীদের বিরুদ্ধে বৃদ্ধ বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে বাড়ির পাশের একটি গাছের নিচে তাকে রেখে আসা হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ঘটনাটি জানাজানি হলে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। যে বাবার সম্পত্তি ভাগ করে নেওয়ার পরও শেষ বয়সে তার মাথা গোঁজার ঠাঁই হলো না, সেই আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে বড় মেয়ে মায়া বেগমের দাবি, তার স্বামী অসুস্থ। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ছোট বোন কাজুলীও তার বাড়িতে থাকেন। ফলে বাবাকে নিজের কাছে রাখা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

মেঝ মেয়ে সাবিনা বেগম বলেন, জমি বিক্রির টাকা থেকে চার বোনকে চার লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দুই ভাইকে নগদ টাকাসহ আট কাঠা করে জমি দেওয়া হয়েছে। এখন বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব বোনেরা কেন নেবেন, এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি।

অন্যদিকে বৃদ্ধের দুই ছেলে আজিজুল ও রেয়াজুলের বক্তব্য জানতে তাদের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। তাদের স্ত্রীরাও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক গৃহবধূ বলেন, শামসুল হক তার জমিজমা সন্তানদের লিখে দিয়েছেন। অথচ এখন সন্তানরাই তাকে আশ্রয় দিচ্ছে না। জমি নিজেদের নামে না নিলে হয়তো আজ তার এমন পরিণতি হতো না। একজন বাবার সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

এদিকে জীবনের শেষ আশ্রয় হারিয়ে অসহায় শামসুল হক মোল্লার কণ্ঠে ফুটে উঠেছে গভীর হতাশা। তিনি বলেন, ‘আমি এখন কোথায় যাব, কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। সারা জীবন কষ্ট করে যাদের বড় করলাম, আজ তাদের কাছেই আমি বোঝা হয়ে গেছি।’

ঘটনার বিষয়ে কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফ-উল-আরেফীন জানান, তিনি বিষয়টি অবগত হয়েছেন এবং ঘটনাস্থলে যাচ্ছেন। সন্তানরা যদি বৃদ্ধ বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন না করেন, তাহলে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যে হাত ধরে সন্তানরা পৃথিবী চিনেছে, যে কাঁধে ভর করে বড় হয়েছে, জীবনের শেষ সময়ে সেই বাবারই ঠাঁই হলো গাছতলায়! সম্পত্তির ভাগ নিতে সন্তানদের যত আগ্রহ, বাবার দায়িত্ব নিতে তত অনীহা—সমাজের জন্য এর চেয়ে নির্মম বাস্তবতা আর কী হতে পারে?

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ছয় সন্তানের জন্য জীবন উৎসর্গ, শেষ বয়সে গাছতলায় আশ্রয় ৯৫ বছরের বাবার!

আপডেট সময় ০২:৫৪:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

সারাজীবনের পরিশ্রম, ঘাম আর ভালোবাসা দিয়ে ছয় সন্তানকে বড় করেছেন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী জমিজমাও ভাগ করে দিয়েছেন তাদের মধ্যে। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই সন্তানদের কাছেই যেন অবাঞ্ছিত হয়ে পড়েছেন ৯৫ বছর বয়সী হাজী শামসুল হক মোল্লা। ছয় সন্তানের কারও ঘরেই জোটেনি তার স্থায়ী আশ্রয়। শেষ পর্যন্ত বাড়ির পাশের একটি গাছের নিচেই কাটছে তার দিন।

হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তর হিরন গ্রামে। হাজী শামসুল হক মোল্লা ওই গ্রামের ওমেদ আলী মোল্লার ছেলে। তার সংসারে রয়েছে দুই ছেলে ও চার মেয়ে। অথচ জীবনের শেষ বয়সে এসে আপনজনদের কাছ থেকেই এমন অবহেলার শিকার হতে হচ্ছে তাকে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে নিজের জমি বিক্রি করে পবিত্র হজ পালন করেন শামসুল হক। এরপর অবশিষ্ট জমিজমাও সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেন। অভিযোগ রয়েছে, ছয় সন্তান মিলে তার সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার পর থেকেই বৃদ্ধ বাবার দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা দেখাতে শুরু করেন।

তার বড় ছেলে আজিজুল মোল্লা পেশায় ফেরিওয়ালা এবং ছোট ছেলে রেয়াজুল মোল্লা বাসের হেলপার। চার মেয়ের মধ্যে মায়া, সাবিনা ও সালমা বিবাহিত। ছোট মেয়ে কাজুলী শারীরিক প্রতিবন্ধী। তার পাঁচ সন্তান নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বৃদ্ধ বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে টানাপোড়েন।

সম্প্রতি কয়েকদিন বড় মেয়ে মায়া বেগমের বাড়িতে ছিলেন শামসুল হক। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে মায়া তাকে ভাইদের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে দুই ছেলে ও তাদের স্ত্রীদের বিরুদ্ধে বৃদ্ধ বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে বাড়ির পাশের একটি গাছের নিচে তাকে রেখে আসা হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ঘটনাটি জানাজানি হলে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। যে বাবার সম্পত্তি ভাগ করে নেওয়ার পরও শেষ বয়সে তার মাথা গোঁজার ঠাঁই হলো না, সেই আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে বড় মেয়ে মায়া বেগমের দাবি, তার স্বামী অসুস্থ। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ছোট বোন কাজুলীও তার বাড়িতে থাকেন। ফলে বাবাকে নিজের কাছে রাখা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

মেঝ মেয়ে সাবিনা বেগম বলেন, জমি বিক্রির টাকা থেকে চার বোনকে চার লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দুই ভাইকে নগদ টাকাসহ আট কাঠা করে জমি দেওয়া হয়েছে। এখন বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব বোনেরা কেন নেবেন, এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি।

অন্যদিকে বৃদ্ধের দুই ছেলে আজিজুল ও রেয়াজুলের বক্তব্য জানতে তাদের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। তাদের স্ত্রীরাও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক গৃহবধূ বলেন, শামসুল হক তার জমিজমা সন্তানদের লিখে দিয়েছেন। অথচ এখন সন্তানরাই তাকে আশ্রয় দিচ্ছে না। জমি নিজেদের নামে না নিলে হয়তো আজ তার এমন পরিণতি হতো না। একজন বাবার সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

এদিকে জীবনের শেষ আশ্রয় হারিয়ে অসহায় শামসুল হক মোল্লার কণ্ঠে ফুটে উঠেছে গভীর হতাশা। তিনি বলেন, ‘আমি এখন কোথায় যাব, কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। সারা জীবন কষ্ট করে যাদের বড় করলাম, আজ তাদের কাছেই আমি বোঝা হয়ে গেছি।’

ঘটনার বিষয়ে কোটালীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফ-উল-আরেফীন জানান, তিনি বিষয়টি অবগত হয়েছেন এবং ঘটনাস্থলে যাচ্ছেন। সন্তানরা যদি বৃদ্ধ বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন না করেন, তাহলে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যে হাত ধরে সন্তানরা পৃথিবী চিনেছে, যে কাঁধে ভর করে বড় হয়েছে, জীবনের শেষ সময়ে সেই বাবারই ঠাঁই হলো গাছতলায়! সম্পত্তির ভাগ নিতে সন্তানদের যত আগ্রহ, বাবার দায়িত্ব নিতে তত অনীহা—সমাজের জন্য এর চেয়ে নির্মম বাস্তবতা আর কী হতে পারে?